সোলেইমানি: শোকাভিভূত ইরানে মৃতদেহ, শোক মিছিলে হাজার হাজার মানুষ ঢল।

প্রথম সময়: ডেস্ক নিউজ | সংবাদ টি প্রকাশিত হয়েছে : 06. January. 2020 | Monday

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

প্রথম সময় অনলাইন ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানির মৃতদেহ ইরানে নিয়ে আসা হয়েছে।

ইরান প্রেসের তোলা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আহভাজ শহরে তার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে অংশ নিয়েছে হাজার হাজার মানুষ।

আগামী কয়েকদিন ধরে তার এই শেষকৃত্যানুষ্ঠান চলবে।

সাতই জানুয়ারি তাকে নিজ শহর কেরমানে দাফন করা হবে।

শনিবার ইরাকে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও অংশ নিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।

বাগদাদে শোক মিছিলে অংশ নেয়া মানুষজন ইরাকি এবং মিলিশিয়া বাহিনীর পতাকা বহন করে এবং শ্লোগান দেয়, ‘আমেরিকার মৃত্যু চাই’।

আরো পড়ুন:
সোলেইমানির জানাজার পর বাগদাদের গ্রিন জোনে হামলা

আমেরিকার মৃত্যু চেয়ে সোলেইমানির জানাজায় শ্লোগান

ইরানের ৫২টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি ট্রাম্পের

সোলেইমানি হত্যার কী প্রতিশোধ নিতে পারে ইরান?

শহরের অনেকগুলো রাস্তা জুড়ে মিছিল চলে। তাদের অনেকের হাতে ছিল সোলেইমানি এবং ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছবি।

তার মৃত্যুতে কয়েকদিন ধরে শোক পালন করতে যাচ্ছে ইরান ও ইরাকের সমর্থকরা।

বৃহস্পতিবার মার্কিন এক হামলায় কাসেম সোলেইমানিসহ মোট ছয়জন নিহত হন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আবু মাহদি আল-মুহানদিস, যিনি ইরানের সমর্থনপুষ্ট খাতিব হেজবুল্লাহ গ্রুপের কমান্ডার এবং ইরাকি মিলিশিয়াদের একটি জোট পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিটের নেতা ছিলেন।
শনিবার ইরাকে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও অংশ নিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।
বাগদাদের গ্রিন জোনে হামলা
ইরাকেজেনারেল কাসেম সোলেইমানির জানাজার বিশাল মিছিলের কয়েক ঘণ্টা পরে বাগদাদ অঞ্চল কেঁপে ওঠে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণে।

সুরক্ষিত গ্রিন জোনে মার্কিন দূতাবাসের কাছাকাছি এমন একটি বিস্ফোরণের আওয়াজ পাওয়া যায়।

ইরাকের রাজধানীর উত্তরাংশের বালাদ বিমান বন্দরের কাছে বেশ কয়েকজনকে গুলি করা হয়, যেখানে মার্কিন বাহিনীর বাস। তবে, ইরাকি নিরাপত্তা সূত্র বলছে হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। ইরানের নেতারা কাসেম সোলেইমানির হত্যার প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
সোনার দাম বৃদ্ধি সোলেইমানি হত্যার প্রভাব?

এসকে সিনহার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি

সড়ক দুর্ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা বেড়েছে যে কারণে

হেফাজতের ভিডিও পোস্ট করে বিড়ম্বনায় ইমরান খান
শোক মিছিলে অংশ নেয়া অনেকের হাতে ছিল কাশেম সোলেইমানের ছবি
ইরানের ৫২টি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালানো হবে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ার করে বলেছেন, তেহরান যদি আমেরিকার নাগরিক কিংবা মার্কিন সম্পদের উপর হামলা চালায় তাহলে তার জবাবে ইরানের ৫২টি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালানো হবে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ৫২টি সাইটকে “টার্গেট করছে” এবং “খুব দ্রুত এবং খুব কঠোরভাবে” হামলা চালানো হবে।

একটি ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর ইরান তার হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার অঙ্গীকার করেছে।এই ধারাবাহিকতায় এমন মন্তব্য করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বাগদাদে মার্কিন বিমান হামলায় নিহত ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সামরিক জেনারেল কাসেম সোলেইমানির মৃতদেহ এখন ইরানে নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।

শনিবার তার প্রথম জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়ে এক শোক মিছিল বের করে এবং “আমেরিকার মৃত্যু চাই” বলে শ্লোগান দিতে থাকে।

কুদস বাহিনীর প্রধান হিসেবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের কৌশলগত অপারেশনের নেতৃত্ব দিতেন কাসেম সোলেইমানি।

তাকে হত্যা করায় আমেরিকার বিরুদ্ধে ‘বড় ধরনের প্রতিশোধ’ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তবে কীভাবে বা কোথায় এ প্রতিশোধ নেয়া হবে, ইরান কি পাল্টা সামরিক হামলা চালাবে, নাকি সাইবার আক্রমণ হবে – তা নিয়ে সারা বিশ্বের সামরিক-কৌশল বিশেষজ্ঞরা নানা রকম বিশ্লেষণ দিচ্ছেন।

জেনারেল সোলেইমানি হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে ইরানের তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ মারান্দি জানান, এই অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য ধরে রাখার পরিকল্পনা পরাজিত করার জন্যই তাকে হত্যা করা হয়েছে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “আমেরিকা সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব নষ্ট করতে চেয়েছিল, ইরাককে দখল করে রাখতে চেয়েছিল, ইসরায়েল লেবাননে দখলদারি করতে চেয়েছিল, সৌদি আরব এবং মার্কিনীরা ইয়েমেনকে পদানত করতে চেয়েছিল। জেনারেল সোলেইমানি এই মার্কিন আধিপত্যের সবগুলো পরিকল্পনা বানচাল করে দিয়েছেন। মার্কিনীদের সাম্রাজ্য কায়েমের চেষ্টায় তিনি ছিলেন কাঁটার মতো। এটাই তাকে হত্যা করার কারণ।”
ইরানের নেতারা বলছেন, এ হত্যার চরম প্রতিশোধ নেয়া হবে
তবে সোলেইমানির শূন্যস্থান পূরণ হবে না, বা তাকে ছাড়া ইরানের আঞ্চলিক নীতি এগিয়ে নিতে সমস্যা হবে – এমনটা মানতে নারাজ মি. মারান্দি।

বর্তমানে জেনারেল কাসেম সোলেইমানির জায়গায় এসেছেন জেনারেল এসমায়েল কানি। যিনি নিজেও একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি।

সোলেইমানির যোগ্য সহযোগীদের নিয়ে তিনি নতুন চিন্তা ও নতুন নির্দেশনা নিয়ে সফলভাবে কাজ করবেন বলে মনে করেন মি. মারান্দি।

তিনি বলেন, “জেনারেল সোলেইমানি একজন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের লোক ছিলেন। তার স্থলে যিনি এসেছেন তিনিও অভিজ্ঞ। তাছাড়া ইরান কোন একক ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাই জেনারেল সোলেইমানির স্থান পূরণ হবে না; বিষয়টি এমন নয়।”

তার মানে কি এই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা ভেবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা পূরণ হবে না?

এমন প্রশ্নের জবাবে মি. মারান্দি বলেন, “আমি মনে করি আমেরিকা বোকার মতো কাজ করেছে। এটা ছিল যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। এতে ইরান আরও ক্রুদ্ধ হয়েছে, ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলা করতে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছে।”

তার মতে, সোলেইমানিকে হত্যা করে আমেরিকা আসলে ইরানকে আরও শক্তিশালী করে দিয়েছে।

এতে একজন ইরাকি কমান্ডারও নিহত হওয়ায়, ইরাক ও ইরান উভয় দেশের বিরুদ্ধেই যুক্তরাষ্ট্র এক প্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
ইরানের তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ মারান্দি
অবশ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন তিনি যুদ্ধ ঠেকাতেই এ আক্রমণ চালিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গ তুললে ড. মারান্দি বলেন, “তিনি (মি. ট্রাম্প) তো নিজেই যুদ্ধে নেমে পড়লেন। আমার মনে হয় না, ইরানের কেউই মি. ট্রাম্পকে গুরুত্বের সাথে নেয়। বরং এই হামলা, আমেরিকার বিরুদ্ধে দুই দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছে – যা তাদেরই ক্ষতি করবে।”

ইরান এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেয়ার কথা বলে আসছে, সেই প্রতিশোধ কি ধরণের হতে পারে, সেটা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

ইরানিরা পরিশীলিত জাতি, আমেরিকানদের মতো অমার্জিত ও পাশবিক নয় উল্লেখ করে মি. মারান্দি বলেন, “ইরানিরা রাজনীতি করে দাবা খেলোয়াড়ের মতো। তারা হিসেব করে, অনেক চিন্তা ভাবনা করে এমন কিছু করবে যাতে আমেরিকানরা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ করে।”

ইরানের এই প্রতিশোধ নিয়ে নানা গুঞ্জন উঠেছে। এ আক্রমণ কি সামরিক হবে না সাইবার আক্রমণ হবে, মধ্যপ্রাচ্যে হবে না উত্তর আফ্রিকায় হবে, নানা জল্পনা চলছে।

আসলে কি ঘটবে, এমন কোন ধারণা দিতে পারেননি মি. মারান্দি।

তবে তিনি বলেছেন, ইরানি এবং ইরাকিদেরও নানা ধরণের সক্ষমতা আছে। আমেরিকানদের অনেক দুর্বল জায়গা আছে।

তার মতে, ইরানিরা অনেক ভাবনাচিন্তা করে উপযুক্ত জবাব কি হবে তা ঠিক করবে – যাতে আমেরিকানদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করতে হয়। তবে কী হবে সেটা এখনই বলা যাবে না।

ছবির কপিরাইট
ইরানের বাইরে, পাকিস্তানেও এই হামলার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে
ইরান কোন আক্রমণ চালালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবার পাল্টা হামলা চালাতে পারে এমন আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা জবাব সামলে নেয়ার ব্যাপারে ইরান কতোটা প্রস্তুত?

মি. মারান্দি জানান, ইরান যে আমেরিকাকে শাস্তি দেবে এ নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই।

“ইরানিরা যুদ্ধ চায় না। তবে যুদ্ধ বাঁধলে তারা পালিয়ে যাবে না। আমেরিকা যা করেছে তা যুদ্ধের শামিল – তাই আমেরিকাকে, ইরান শাস্তি দেবে। আমেরিকান, সৌদি এবং আমিরাতদের যা আছে ইরান তা সব ধ্বংস করে দেবে। তখন আমেরিকানরা বুঝবে যে তারা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।” তিনি বলেন।

এক্ষেত্রে ইরানের শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেনসহ, পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল জুড়ে থাকা মিত্র দেশগুলো।

এছাড়া মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ইরানের অনেক রকম সক্ষমতা আছে বলেও মনে করেন মি. মারান্দি।

“ইরান কঠোর না হলে আমেরিকানরা আবার এমন কাজ করবে। আমেরিকা জানে ইরানে তারা যদি আবার আক্রমণ চালায় তাহলে ইরানের জবাব হবে আরও তীব্র। আমেরিকানরা জানে যে এ যুদ্ধে তারা জিততে পারবে না।”

জেনারেল সোলেইমানির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র দেশগুলোয় প্রভাব ফেলবে বলে জানান মি. মারান্দি।

“ইরান থেকে লেবানন পর্যন্ত যে শিয়া ক্রিসেন্ট রয়েছে তার পাশাপাশি সিরিয়া, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তানের সুন্নি সম্প্রদায়ও ইরানের মিত্রদেশ। জেনারেল সোলেইমানির মৃত্যুতে তারা এক হয়ে আরও শক্তিশালী হবে। আমেরিকা খুবই বোকার মতো একটা কাজ করেছে।”
ক্ষেপনাস্ত্র সক্ষমতা ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ
আরও পড়তে পারেন:
ইরান নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশল আসলে কী?

সোলেইমানি হত্যা কি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ডেকে আনবে?

সোলেইমানি হত্যায় ইরানে কেমন প্রতিক্রিয়া হচ্ছে?

ইরান সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থাকায় তাদের সামরিক সংঘাতে যাবার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এ ব্যাপারে মি. মারান্দি অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রকেই অনেক বেশি নাজুক অবস্থায় দেখছেন। তার মতে দুই দেশের মধ্যে কোন সংঘাত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি বেশি হবে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৮৫ বার




Archives