গণপরিবহনে নারী: কীভাবে বুঝবেন যে বিপদের মুখোমুখি হতে পারেন কোন সময়

প্রথম সময়: ডেস্ক নিউজ | সংবাদ টি প্রকাশিত হয়েছে : ১১. মে. ২০১৯ | শনিবার

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

অনলাইন নিউজ:

নারী যাত্রীদের কত হয়রানি।  বাংলাদেশে নারী যাত্রীদের অনেকেই বলছেন, রাতে চলাচলের ক্ষেত্রে পরিবহন সংশ্লিষ্ট লোকজন কিংবা পুরুষ যাত্রীদের দ্বারা শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তারা।একদিকে নিরাপত্তা নিয়ে আস্থাহীনতা অন্যদিকে সামাজিক অসচেতনতার কারণে দিন দিন নির্যাতন ও নিগ্রহের ঘটনা বাড়ছে।

নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, নিরাপত্তার জন্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর দৃশ্যমাণ তৎপরতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নারীদের প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই।

রাত ন’টায় ঢাকার মোহাম্মদপুরে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বিভাগে কর্মরত রিমা ইসমাত।

মোহাম্মদপুর থেকে তার গন্তব্য বেড়িবাধ পার হয়ে বসিলা। এলাকাটা বেশ নির্জন।

তাই রিমা ইসমাতও বাসে ওঠেন নানা হিসেব নিকেষ করে

বলছিলেন, ”আমি বাসে উঠি। যদি দেখি অনেকে নেমে যাচ্ছে এবং যাত্রী খুব কম তখন আমিও নেমে যাই। কারণ সবসময়ই একটা ভয় কাজ করে।”

মিসেস ইসমাতের আশংকা রাতের যাত্রায় নির্জন রাস্তায় যৌন হেনস্থার শিকার হতে পারেন তিনি।

এমন আশংকার ভিত্তিও আছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণপরিবহণে নারীদের উপর যৌন নিপীড়ন হবার অনেক ঘটনাই সামনে এসেছে।

মিসেস ইসমাতের নিজেরও আছে তিক্ত অভিজ্ঞতা।

‘একদিনের ঘটনা, আমার ডানপাশে একজন পুরুষ যাত্রী বসা। বামপাশে আরেকজন দাঁড়ানো যাত্রী। ডানপাশে যিনি বসা তাকেও আমি ট্যাকল করতে পারছি না, অন্যদিকে দাঁড়ানো যাত্রীও আমার উপর চলে আসছেন। আমি বললেও শোনে না। অন্য পুরুষ যাত্রীরাও নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত।”

রাতে নিরাপত্তা বলতে পুলিশের টহল গাড়িছবির কপিরাইটবিবিসি বাংলা
Image captionরাতে নিরাপত্তা বলতে পুলিশের টহল গাড়ি

বাংলাদেশে দূরপাল্লার বাসগুলোতে রাতের বেলায় যেসব নারী যাত্রী ভ্রমণ করেন তাদের জন্য কী নিরাপত্তা আছে?

যতটুকু দেখা যাচ্ছে, এসব পরিবহনে নিরাপত্তা বলতে সড়কে পুলিশের টহল আর বাসে কোম্পানি নিযুক্ত সুপারভাইজার।

রাজধানীর গাবতলীতে যশোরগামী একটি বাসের চালক অবশ্য জানালেন, তাদের বাসে নারী যাত্রীরা যথেষ্ট নিরাপদ।

“আমাদের বাসে যদি একলা মহিলা যাত্রী থাকে। তাহলে আমরা চেষ্টা করি, তার পাশের সিটে একজন মহিলা যাত্রী দেয়ার। না দেয়া গেলে সেক্ষেত্রে আমাদের সুপারভাইজার আছে। আমরা খেয়াল রাখি।”

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে গত বছরের ২৫শে আগস্ট দেশজুড়ে আলোচিত কলেজছাত্রী রুপা হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিলো চলন্ত বাসের ভেতরে বাস চালক ও সহযোগীদের মাধ্যমেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা বলছিলেন, বাসে খোদ পরিবহন সংশ্লিষ্টরাই অনেক সময় ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ান।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, “একদিন নাইট কোচে আমি একাই ঢাকা থেকে চাপাইনবাবগঞ্জ যাচ্ছিলাম। পাশের সিট খালিই ছিলো। রাত যখন একটু বাড়লো, তখন বাসের সুপারভাইজার এসে দেখা গেল বারবার আমার সঙ্গে গল্প করার চেষ্টা করছে।”

“একটা পর্যায়ে রাত যখন আরো গভীর হলো তখন সে আমার পাশের সিটটায় এসে বসে পড়লো। আমি যখন তাকে বকা দিলাম এবং আমার নানু যিনি এলাকায় বেশ প্রভাবশালী তার পরিচয় দিলাম তখন সে ভয় পেয়ে চলে যায় এবং বলে আপু রাগ করিয়েন না। কিন্তু এরপরও পুরোটা পথ আমি সে রাতে ঘুমাতে পারিনি।”

বেসরকারি সংগঠন একশন এইডের একটি জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে দিনের বেলাতেই যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে নানারকম হেনস্থার শিকার হন নারী যাত্রীদের একটা বড় অংশ।

তাদের জরিপে, বাসে পুরুষ যাত্রীদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন ৪২ শতাংশ নারী যাত্রী। এছাড়া পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫৩ শতাংশ নারী যাত্রী।

এরসঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাতে নারীযাত্রীদের হয়রানি, ধর্ষণ এমনকি হত্যার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে ভীতি বাড়ছে।

ফলে দিনের বেলা নারীদের স্বাভাবিক চলাচল দেখা গেলেও রাতে তা অনেকটাই কমে আসে।

রাজধানীর সদরঘাট থেকে সাভার রুটে চলাচলকারী স্বজন পরিবহনের একটি বাসে কথা হয় দুইজন যাত্রীর সঙ্গে।

এর মধ্যে একজন নারী যাত্রী বলছিলেন, ” কিছু ছেলেপেলে আছে, নানারকমভাবে তারা হয়রানি করে। মানে মহিলাদের হয়রানি তো করেই।”

আরেকজন পুরুষযাত্রী বলছিলেন, “রাতে মহিলাদের নিরাপত্তার জন্য সরকারের ব্যবস্থা নেয়া দরকার। আমাদের পুরুষদেরও মানসিকতা পরিবর্তন দরকার।”

কিন্তু গণরিবহনে নারীদের নিরাপত্তাবোধের এই অভাব দূর করার কি কোন উপায় আছে?

নারী অধিকারকর্মী কাশফিয়া ফিরোজ বলছেন, পুরো নগরীটাকেই নারীবান্ধব হতে হবেছবির কপিরাইটবিবিসি বাংলা
Image captionনারী অধিকারকর্মী কাশফিয়া ফিরোজ বলছেন, পুরো নগরীটাকেই নারীবান্ধব হতে হবে

নারী অধিকার কর্মী কাশফিয়া ফিরোজ বলছিলেন, “যে শহরে দিনের বেলা নারীরা নিরাপদ নয়, সে শহরে রাতেও নিরাপদ হবে না। নিরাপদ করতে হলে শহরটাকেই নারী বান্ধব করতে হবে। বাসের যারা হেলপার, ড্রাইভার আছেন তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। যেন বিপদে পড়লে নারীরা তাদেরকে রিপোর্ট করতে পারে এবং তারাও নারীদের সহায়তায় এগিয়ে আসে।”

ভারতের দিল্লীতে নির্ভয়া হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ঘটনার পর সেখানে নারীরা যে কতটা অনিরাপদ তা আলোচিত হয়েছিলো বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশে রূপার ঘটনাটিও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে এখানেও নির্জন রাস্তায় একাকী নারী সমানভাবে অনিরাপদ। বাংলাদেশে যেখানে সর্বক্ষেত্রে নারীপুরুষ সমান অধিকার, সমান অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়, সেখানে গণপরিবহণে একাকী নারীর নিরাপত্তাবোধের ইস্যুটি নিসন্দেহে বড় একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

 

সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের একটি বাসে একজন নার্সকে ধর্ষণের পর তাকে হত্যার ঘটনায় আবারো আলোচনায় এসেছে গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি।

ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ঐ নার্স সোমবার রাতে কিশোরগঞ্জে নিজ গ্রামে ফেরার পথে ধর্ষণের শিকার হন।

পরে এই ঘটনার সাথে জড়িত কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাপরিচালক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বিবিসিকে জানান যে তাদের এক সমীক্ষা অনুযায়ী ২০১৮ সালে গণপরিবহনে ২১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

মি. চৌধুরী বলেন, এ ধরনের ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা এর চাইতেও অনেক বেশি।

এরকম পরিস্থিতিতে গণপরিবহনে নারীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোন পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন

ঢাকার বাসিন্দা মার্জিয়া প্রভা জানান, রাতে বাসে চলাচলের সময় অপেক্ষাকৃত খালি বাসে কখনোই ওঠেন না তিনি।

“রাতে অনেক সময় দেরি হয়ে গেলেও খালি বাসে উঠি না। অনেক সময় যেই বাসে অল্প কয়েকজন পুরুষ যাত্রী থাকেন, যেখানে আমিই একমাত্র নারী যাত্রী, সেসব বাসেও উঠি না।”

এছাড়াও রাতে চলাচলের সময় কোন প্রতিষ্ঠানের বাস, সেটি কোন রাস্তা দিয়ে যাবে এসব বিষয়ও বিবেচনায় রাখেন বলে জানান গণপরিবহনে চলাচল করা নারী যাত্রীরা।

কোন পথ দিয়ে যাচ্ছে

নারীদের অধিকাংশই জানান যে গণপরিবহনটি কোন রাস্তা দিয়ে যাবে সে বিষয়টিও তারা আগে থেকে চিন্তা করে থাকেন।

বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন এরকম একজন শাহনাজ পারভীনকে প্রায়ই গণপরিবহনে চলাচল করতে হয়।

তার বাসা অপেক্ষাকৃত নির্জন একটি এলাকায়।

ভাড়ায়-চালিত মাইক্রোবাসে চলাচল করতে গিয়ে একবার বিরুপ অভিজ্ঞতার শিকার হন তিনি।

এরপর থেকে সন্ধ্যার পর সেসব এলাকায় সাধারণত একা গণপরিবহণ ব্যবহার করেন না তিনি।

নির্জন এলাকা দিয়ে চলাচল করার বিষয়ে মার্জিয়া প্রভা বলেন, “সন্ধ্যার পর বাস কোন রাস্তা দিয়ে যাবে, নারী হিসেবে সেবিষয়টি সবসময় মাথায় রাখতে হয়। অনেকসময় অসুবিধা হলেও বিশেষ কিছু এলাকা পার হওয়ার আগেই বাস থেকে নেমে পড়ি।”

পরিবহন শ্রমিকদের আচরণ

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাপরিচালক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, গণপরিবহনে চলাচলের সময় পরিবহন শ্রমিকদের আচরণের দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন নারীদের।

মি. চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশে প্রায় সব বাসেই ড্রাইভারের পাশে বা পিছনে নারীদের সিট রাখা থাকে। তাই ড্রাইভার যদি নারীদের দিকে বারবার তাকান বা লুকিং গ্লাস দিয়ে বারবার দেখেন তাহলে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।”

শাহনাজ পারভীন বলেন, নির্জন এলাকা দিয়ে চলার সময় বা একা নারী হিসেবে কোনো গণপরিবহনে চলাচল করার সময় চালক, সুপারভাইজার বা হেলপারের আচরণের দিকে সবসময় খেয়াল রাখলে নারীরা পরিবর্তনটা বুঝতে পারবেন।

নিজের একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে মাশহুদা হক ইফা জানান, একবার বাসে একটি ঘটনার প্রতিবাদ করায় ঐ বাসের চালক ও সহকারীর বিরুপ আচরণের শিকার হন তিনি। সেসময় তার সহযাত্রীরাও ঐ ঘটনার কোনো প্রতিবাদ করেননি বলে জানান তিনি।

যাত্রী হিসেবে যখন একা

গণপরিবহনে চলাচল করেন এমন কয়েকজন নারী জানান, নির্জন এলাকা দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে বা রাতে তারা কখনোই একা চড়েন না।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাপরিচালক মোজাম্মেল হক চৌধুরীও বলেন, গণপরিবহনে চলাচলের ক্ষেত্রে বাসে কখনোই একা ওঠা উচিত নয় একজন নারীর।

নারীদের অধিকাংশই মনে করেন যখন কোনো বাসে তারা একা থাকেন তখন সামনের দিকে দরজার কাছের সিটে বসলে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বোধ করেন তারা।

বিশেষ গণপরিবহন এড়িয়ে চলা

প্রায়ই রাতে বাসে যাতায়াত করেন এমন একজন সুরাইয়া জাহান জানান যে তিনি পরিচিত প্রতিষ্ঠানের বাস ছাড়া ওঠেন না।

“বেশ কয়েকবার দেখেছি চেনা রুটে অল্প যাত্রী নিয়ে অচেনা বাস চলাচল করছে। সেসব বাসে কখনোই উঠি না”, বলেন তিনি

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯১ বার




Archives