এমন অপরাজনীতি থেকে কবে মুক্তি পাবে দেশের জনগন।

প্রথম সময়: ডেস্ক নিউজ | সংবাদ টি প্রকাশিত হয়েছে : ২২. আগস্ট. ২০১৯ | বৃহস্পতিবার

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক

 

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে গ্রেনেড হামলায় হতাহত লোকজন। ফাইল ছবিখুনোখুনির রাজনীতিতে বাঙালিরা যে বেশ পারঙ্গম, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। খুনোখুনির ওপর আদর্শের একটা চাদর চড়িয়ে দিয়ে তা জায়েজ করার চেষ্টা থাকে। কখনো জাতীয়তাবাদের নামে, কখনো বিপ্লবের নামে, কখনো ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে, কখনোবা প্রতিদ্বন্দ্বীকে রাজনীতির ময়দান থেকে সরিয়ে দেওয়ার নামে চলে খুনখারাবি। তবে সব খুনের লেভেল বা মূল্যমান এক নয়। কিছু কিছু ঘটনা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজে বিরাট প্রভাব ফেলে। ১৯৭২ সাল থেকে এ দেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড কম হয়নি। এসব ঘটেছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে। কিছু কিছু হত্যাকাণ্ড সমাজের চালচিত্র অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের কথা বলা যায়। এতে শুধু সরকার বদল হয়নি, রাষ্ট্রের গতিপথ বদলে গিয়েছিল। এ নিয়ে অনেক লেখাজোখা হয়েছে, আরও হবে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে বড়সড় একটা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। ঘটনাটি যেভাবে ঘটানো হয়েছিল, তাকে সামরিক পরিভাষায় রীতিমতো অ্যামবুশ বলা যেতে পারে। চারদিক ঘিরে আক্রমণ হয়েছিল। আক্রান্তরা বুঝতেই পারেননি, এমনতর হামলা হতে পারে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতা–কর্মীসহ মোট ২৪ জন নিহত হয়েছিলেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমান ছাড়া বাকিরা তেমন পরিচিত নন। হামলার অন্যতম টার্গেট ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে যান। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে, এটি ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা। এটি সফল হয়নি। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন নিহত হন। একজন তো ছিলেন তাঁর নিরাপত্তারক্ষী, যিনি নিজের পিঠ পেতে দিয়ে শেখ হাসিনাকে আড়াল করতে
গিয়ে প্রাণটি বিসর্জন দেন। এই ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় অঘটন হিসেবে সংবাদ শিরোনাম হয়ে আসছে

 

২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ড নিয়ে মামলা হয়েছে। নিম্ন আদালতের বিচারে রায়ও হয়েছে। ওই সময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ছিল ক্ষমতায়। যেকোনো অঘটন ঘটলে তার দায় স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর এসে পড়ে। এ ঘটনায় বিএনপি সরকারের দায়দায়িত্বের প্রশ্ন শুরু থেকে উঠলেও এর সঙ্গে সরকারের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি একেবারে শুরুতে তেমন আলোচিত হয়নি। কিন্তু পরে অভিযোগ উঠতে শুরু করে, সরকারের প্রশ্রয়ে কিংবা মদদেই ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। বিএনপি সরকার নিজেই এ দায় নিজের কাঁধে নিয়েছে। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের চেষ্টা থাকলে বিএনপি সরকার দায় এড়াতে পারত। কিন্তু অতি চালাকি করতে গিয়ে তারা নিজেদের জালে নিজেরাই আটকে গেছে।

সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারকের নেতৃত্বে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিশন তৈরি করেছিল বিএনপি সরকার। ওই বিচারক তদন্ত করে এটুকু বলতে পেরেছেন, ঘটনার পেছনে প্রতিবেশী একটি দেশের হাত আছে। অভিযোগের তিরটি সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে। এর কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ছিল না। এ ঘটনা প্রমাণ করে, বিচার বিভাগীয় তদন্ত হলেই তা সুষ্ঠু হবে, তেমনটি নয়।

ওই সময় নোয়াখালীর জনৈক জজ মিয়াকে আসামি বানিয়ে সরকারি সংস্থা একটি চিত্রনাট্য তৈরি করেছিল। প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জজ মিয়া রহস্য ফাঁস হয়ে যায়। প্রমাণ হয় যে মামলাটি সাজানো। তখন এটি আর বোঝার বাকি থাকে না যে কর্তৃপক্ষ মামলাটির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য জজ মিয়া নাটক সাজিয়েছিল। এভাবেই বিএনপি সরকার বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। পরে মামলাটির পুনঃ তদন্ত হলে অনেক রাঘববোয়ালের নাম বেরিয়ে আসে। তার মধ্যে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার উঁচু পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সরকারের নেতৃস্থানীয় মন্ত্রীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। এমনকি বিএনপির দ্বিতীয় প্রধান নেতা তারেক রহমানও ফেঁসে যান। বিএনপি অবশ্য বরাবরই দাবি করে আসছিল যে তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে এবং আওয়ামী লীগ সরকার মামলাটির রাজনৈতিকীকরণ করেছে। তবে এটা অনস্বীকার্য যে এই মামলা বিএনপিকে ব্যাকফুটে নিয়ে গেছে।

মামলার তদন্ত যে সব সময় সঠিকভাবে হয় এবং আদালতের রায় যে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। মামলা পরিচালনাতেও রাজনীতি ঢুকে যায়। তা না হলে মঞ্জুর হত্যা মামলা এখনো ঝুলে আছে কেন? অথবা ১৯৮৮ সালে এরশাদের শাসনামলে চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলার ফলে যে ২৮ জন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও নিরীহ মানুষ নিহত হলেন, তার বিচার হলো না কেন? যে কারণে হত্যাকাণ্ডের দায় খালেদা জিয়ার সরকারকে নিতে হয়েছে, সেই একই কারণে এরশাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কেন হলো না? রাজনৈতিক সমীকরণ অনেক সময় গুরুতর অপরাধের ওপর পলেস্তারা লাগিয়ে দেয়।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে শেখ হাসিনা স্বজনদের হারিয়েছেন। এ রকম একটি বিপর্যয়ের পর কারও পক্ষে যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত আচরণ করা কঠিন। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধরেছেন। অপেক্ষা করেছেন। বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিষয়টির নিষ্পত্তি করেছেন। এই হত্যাকাণ্ডের যাতে বিচার না হয়, সে জন্য জিয়াউর রহমানের সরকার সংবিধানে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জুড়ে দিয়েছিল। তারপরও বিএনপির সঙ্গে হাসিনার আওয়ামী লীগ রাজনীতি করেছে, যুগপৎ আন্দোলন করেছে। কিন্তু ২১ আগস্ট দুই দলের মধ্যে এবং রাজনীতির দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে গড়ে দিয়েছে অলঙ্ঘনীয় এক দেয়াল। শেখ হাসিনার পক্ষে এটি এড়িয়ে যাওয়া কিংবা ভুলে যাওয়া কি সম্ভব?

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, ২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা কিংবা প্রশ্রয়দানকারী হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে প্রকাশ্যে অভিযুক্ত করেছেন এখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই অভিযোগের কি কোনো ভিত্তি আছে, নাকি এটি নিতান্তই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ? প্রধানমন্ত্রীর কথা তো হেলাফেলা করা যায় না। এই ঘটনায় খালেদা জিয়ার সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা ভালোভাবে তদন্ত করে দেখা দরকার। তদন্তই বলে দেবে, খালেদা জিয়া দোষী না শেখ হাসিনার অভিযোগের ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিটাকে একটা সুস্থ জায়গায় নিয়ে আসার জন্য এ প্রশ্নের মীমাংসা খুবই জরুরি।

খুনোখুনির রাজনীতি থেকে আমরা কি সহসা মুক্তি পাব? ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ যে কত নিচে নামতে পারে, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোই তার প্রমাণ। প্রশ্ন হলো, এ অপরাজনীতির শেষ কোথায়? রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের এই ঊর্ধ্বগামী প্রবণতা কখন থামবে?

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫২ বার




Archives