নির্বাক আগস্ট

প্রথম সময়: ডেস্ক নিউজ | সংবাদ টি প্রকাশিত হয়েছে : ০১. আগস্ট. ২০১৮ | বুধবার

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

ইরানী বিশ্বাস,
সম্পাদক প্রথম সময়

স্বামীর কর্মস্থল জার্মানী যাবে হাসু। কলেজে ভর্তির পর রেহানা জানালো হাসু আপার সাথে বিদেশে যাবে। জয়ের জন্মদিন ২৭ জুলাই। ঢাকায় জন্মদিন করে যেতে বললেন হোসুর মা। নাতির জন্মদিনে পায়েস রান্না করতে চান তিনি। সারা বছর কতোবার পায়েস রান্না হয়। সকলে বলে, হাসুর আব্বার জন্মদিনের মতো নাকি আর কখনো হয় না। তাই এবার নাতির জন্মদিনে ওই রকম স্বাদের পায়েস রান্না করতে চান তিনি। ঘরোয়া উৎসবে জয়ের জন্মদিন পালন করার প্রস্তুতি চলে। অবাক করে সেদিন হাসুর মা’র পায়েসে স্বাদ হয়েছিল ঠিক হাসুর আব্বার জম্মদিনের মতো।
বাড়ি থেকে বেরুবার সময় মাকে জড়িয়ে অনেক্ষন কাঁদে হাসু। মা-মেয়ে কারও কান্না থামতে চাইছে না। পাশে থেকে বঙ্গবন্ধু বললেন, বিমানের সময় হয়ে গেছে। কথাটা শেষ করতেই বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন তাঁর চোখ দুটিও অশ্রুসিক্ত। এবার বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে হাসু। বাবা-মেয়ের প্রানস্পন্দন এক হয়ে যায়। তারপর লুফথানসা এয়ারলাইনসের একটি বিমানে করে রেহানাকে নিয়ে হাসু চলে যায় জার্মানি।
বাড়িটা খালি হয়ে যায়। বিছানায় শুয়ে আছে রাসেল। দিন গড়িয়ে বিকাল হলেও ওঠে না রাসেল। তাই মা তার মন ভাল করার জন্য বলে, কয়েকদিন পর টুঙ্গিপাড়া যাবো। রাসেলের ঠোটে হাসি ফুটিয়ে বলে, অনেক বিস্কুট আর লজেন্স নিবা কিন্তু।
১৪ আগস্ট বিকালটা ছিল সাদামাটা। রাত সাড়ে আটটায় গণভবন থেকে বাড়ি ফিরবেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু বাড়ির সামনে আসতেই মার্সিডিজ গাড়িটার স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। ড্রাইভার একবার, দুইবার, তিনবার স্টার্ট দিতেই চলতে শুরু করলো। বাবার গাড়ির শব্দ রাসেলের খুব চেনা। তাই দৌড়ে নীচে নেমে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। প্রতিদিনের মতো আজও সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে কাজের ছেলে ফরিদকে বললেন, বেগম সাহেবের মেজাজ কেমন? জবাবে ফরিদ খুশি হয়ে উত্তর দেয়, সব ঠিক আছে।
শোবার ঘরে দাপ্তরিক পোশাক বদল করে লুঙ্গি, গেঞ্জি পরে বাথরুমে হাত-মুখ ধুতে যান তিনি। চোখের অসুখ হবার পর ডাক্তার বলেছিলেন, দিনশেষে একা চোখ বন্ধ করে কিছুটা সময় বসে থাকতে। এতে ব্রেন, নার্ভ রিলাক্সড হয়। আজ তার ব্যাতিক্রম হলো। কারণ মহাজাতক শহিদ আলবোখারি নামের একজনের ভাগ্যগণনার ফল জানাতে বিকাল থেকে বাসায় এসে বসে আছেন দুজন মানুষ। একজন ভাগ্নে শেখ মনি ও ফটোসাংবাদিক জহিরুল হক। মহাজাতক তাদের বলেছেন, যেকোন সময় বঙ্গবন্ধুর প্রাণনাশের ঘটনা ঘটবে।
বারান্দায় চেয়ারে বসে আছেন বঙ্গবন্ধু। অনেক্ষন থেকে চিন্তা করছেন শেখ মনি, কথাটা কিভাবে তুলবে। তারপর ভয়ে ভয়ে কাছে গিয়ে কথাটা তুললেন জহিরুল। তিনি বললেন,
– জানি আপনি খুব বিজি, এখন বিশ্রামের সময়, তবুও আমাদের ওপর বিরক্ত হবেন না। কথার রেশ ধরে বলে উঠলেন মনি,
-কয়েকদিন দেশের বাইরে ঘুরে আসুন।
– কেন? অবাক হয়ে বঙ্গবন্ধু জানতে চাইলেন।
– মহাজাতক বলেছেন, যেকোন সময় আপনার ওপর বিপদ নামতে পারে।
– কে এই মহাজাতক?
– নাম করা জ্যোতিষ।
– ও..ও..ও
– কয়েকদিন দেশের বাইরে ঘুরে আসুন। গলার স্বরে শান্ত ভাব রেখে বললেন জহিরুল।
– সম্ভব না। কাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোগ্রাম, তোরা বাড়ি যা। কি আর করা, অগত্যা জহিরুল স্থান ত্যাগ করলো। শেখ মনি কিছুক্ষন বসে থেকে সেও চলে গেলো।
প্রতিদিনের রুটিনানুযায়ি বিশ্রাম নেওয়া হলো না। কিছুক্ষন পর রাসেল এসে সংবাদ দিলো, মা, খেতে ডাকছেন।
ধানন্ডি ৩২ নাম্বারে বসবাসরত মানুষটির হৃদয় অনেক বড় হলেও ডাইনিং টেবিলটা খুব বড় নয়। মাঝারি আকারের। এর ওপরে ভাত, ডাল আর বড় বড় কৈ মাছের ঝোল সাজানো রয়েছে। ঘরে ঢুকে চোখ পড়তেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,
– হাসুর মা এত বড় কৈ মাছ কোথায় পেলে?
– নাসের খুলনা থেকে এনেছে। উত্তরে হাসুর মা বলেন।
– বড় কৈ মাছ তো আজকাল দেখাই যায় না। প্লেট দাও, খাই।
এরপর বেসিনে হাত ধুয়ে খাবার টেবিলে বসেন তিনি। নিজে একটা মাছ তুলে নেন। পরে হাসুর মা আরো দুটো মাছ তুলে দেন বঙ্গবন্ধুর প্লেটে।
ফযরের আযান দিয়েছে। হাসুর মা উঠেছেন নামায পড়তে। নামায শেষে তিনি একটু শুয়ে থাকেন তারপর উঠে নিত্য কাজে ব্রতী হন। হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠলো। মনে মনে ভয় পেয়ে জান তিনি, কারো কোন খাবার খবর নয়তো?
রাত ৪টা বেজে ২৫ মিনিট। হঠাৎ বাড়ির সামনে গুলির শব্দ। এই গুলি এসে আচমকা বাড়ির দেয়ালে, কার্নিশে, ছাদে এসে পড়তে লাগলো। গুলির শব্দ শুনে কামাল দৌড়ে নীচে যায়। সেখানে তাকে গুলি করা হয়। তারপর একদল মুখোশ পরা সেনা ‘হ্যান্ডস আপ’ বলতে বলতে বাড়ির ভেতর দোতলায় চলে আসে। বঙ্গবন্ধু তখন মেঝের পরে দাড়িয়ে আছেন। তামাটে খয়েরি রঙের পাইপটা হাতে ধরলেন। খালি পাইপ হাতে নিয়ে তিনি বাইরের পথে পা বাড়াতে যাবেন, এমন সময় আচমকা হাসুর মা তাঁর বাম হাত ধরে ফেললেন। এর পর দুই হাতে জাপটে ধরলেন বুকের সাথে। মায়ের আঁচল ধরে ভয়ে কাপছে ছোট্ট রাসেল।
– হাসুর মা এবার ছাড়ো, নিচে যাই।
এ কথা বলে বঙ্গবন্ধু দরজার কাছে আসতেই দেখে পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছে মহিউদ্দিন। পেছনে হুদা আর নূর। তাদের হাতেও অস্ত্র। তাদের দেখে বলে উঠলেন,
– কি চাস তোরা?
– শ্যাট আপ, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।
নূরের এ কথা শুনে আবার প্রশ্ন করেন বঙ্গবন্ধু,
– কই নিবি আমারে?
– আমাদের সাথে আসুন।
তাদের অনুসরণ করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে বঙ্গবন্ধু। সিঁড়িতে কয়েকধাপ নামতেই দৌড়ে আসে মোসলেমউদ্দিন। হাতে গুলি ভরা স্টেনগান। কোমরের দুই পাশে দুইটা পিস্তল ঝলছে। দৌড়ে ওঠার সময় ডান পা পিছলে যায়। কোন মতে উঠে হাতের স্টেনগানের ট্রিগার টান দেন। সিঁড়ির ওপর পড়ে যান বঙ্গবন্ধু। কয়েকটা গুলি শরীর ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়। মোসলেম গুলি করার পর পিস্তল দিয়ে বঙ্গবন্ধুর তলপেটে গুলি করে মেজর নূর। এর পর রিভালবার দিয়ে গুলি করে হুদা।
গুলির শব্দে বেরিয়ে আসে হাসুর মা। সিঁড়িতে পড়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর কপালে, বুকে হাত বুলাতে থাকেন তিনি। কয়েকবার ঠোঁট নাড়ার চেষ্টা করলেন বঙ্গবন্ধু। হয়তো কিছু বলার ছিল। বলতে গিয়ে প্রানস্পন্দনটাই বেরিয়ে গেল। অসাড় হয়ে যায় দেহ।
১৪ আগস্টের শেষ বিকালটা কি অপেক্ষা করেছিল, অন্ধকারময় এক ভোরের জন্য? বিশ্ব ক্যালেন্ডারের পাতা কি জানতো কাল ভোরে তার বুকে রক্তক্ষত চিহ্ন আঁকা হবে? ভোরের কুয়াশা কি জানতো সকালের সূর্য ওঠার আগে এক অমানিশা সন্ধ্যা নামবে? পাখিরা কি জানতো আজ সকালে তারা মধুর কন্ঠে শিষ দিতে পারবে না? অথবা ভোরের সূর্য কি জানতো বাংলার শেখ মুজিব আর গর্জে উঠবে না !! না, কেউ কিছু জানতো না। কেবল জানতো, যাদের ভালবেসে আদর করে কাছে কাছে রাখতেন, সেই ডালিম, মোসলেহউদ্দিন, শাহরয়িার, নুর, মহিউদ্দিন, হুদা আর তাদের দলপ্রধান।
আজ আগস্টের শোকাবহ প্রথম দিন। পিতৃহত্যার দায়ভার নিয়ে এই বাংলায় আমার জন্মহয়েছিল। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন পিতৃহত্যার দায়ভার বহন করতে হবে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪৬০ বার




Archives