করোনা ও আসন্ন অর্থনীতি

প্রথম সময়: নিউজ ডেস্ক | সংবাদ টি প্রকাশিত হয়েছে : ০৩. এপ্রিল. ২০২০ | শুক্রবার

করোনা ও আসন্ন অর্থনীতি

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

ইরানী বিশ্বাস সম্পাদক

আমরা বিভিন্ন সময় ভাইরাস শব্দটার সঙেগ পরিচিত হয়েছি। তবে এখন বিশ্বে যে ভাইরাসটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা এবং ততটস্থ তার নাম করোনা ভাইরাস। এটি এমন একটি ভাইরাস যার, এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের কাছে যেতে কোন পার্মিশান লাগে না। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে লাগে না কোন পাসপোর্ট, ভিসা। সে কোন সীমান্তের কাঁটাতার মানে না। ভয়পায় না সীমান্ত রক্ষিবাহিনী বা বিমান বন্দরের পরীক্ষাকারিকে। শোনে না কোন মন্ত্রমুগ্ধকর ভাষন, মানে না কোন সরকারী শাসন। এটা অনেকটা জলবায়ু সংকটের মতো সমন্বিত সমস্যা। তাই এই সমস্যায় নিজে বাঁচো বা একা বাঁচার দর্শন কাজ করছে না। এখানে ব্যক্তি বা কোন দেশ নয়, চলছে সমন্বিত প্রয়াস। এখন প্রতিযোগীতা ছাপিয়ে উঠে আসছে সহযোগিতার কথা। একাত্বতার কথা। কে কাকে নিয়ন্ত্রন করবে ! এ সমস্যা সকলের কাছে পৌছে গেছে। দেশের সাধারণ থেকে দেশ নায়ক বা দেশ প্রধানের কাছে। বিশ্বের সকলের চোখে অসহায়ত্বের ছাপ। কে, কাকে সহায়তা করবে?
আমরা দেখেছি চায়না, ইতালী, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্রতে এ পর্যন্ত প্রায় একশ’র কাছাকাছি বা তার বেশি ডাক্তার সেবা দিতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন। সেনাবাহিনী বা প্রশাসনের লোকজন দায়িত্ব বা মানবতার জন্য মাঠে নেমেছেন সাহায্য করতে। সংবাদ কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় কাজ করছেন। প্রশ্ন হলো, এসব সেবাদানকারী মানুষদের পরিবার আছে। তাদের জীবনের ঝুঁকি আছে। এদের সুরক্ষা কোথায়? তাহলে আমরা কার দিকে চেয়ে আছি। এদেশের জনগণ প্রতিনিয়ত নিজেদের অবাধ্য করে তুলছে। মনে করছে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাইরে ঘুরে বেড়ানোটাই বুঝি জয় আর শক্তি দেখানো। কথাটা মোটেই ঠিক না। করোনা মোকবিলা করা সরকারের একার দ্বায় না। আমি প্রথমেই বলেছি এটা সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল।

মনে রাখতে হবে, চীন হচ্ছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। প্রায় তিনদশক ধরে চীনকে বলা হচ্ছে ‘ওয়ার্কশপ অব দি ওয়ার্ল্ড’। অথচ সেখান থেকেই এই সামান্য ভাইরাসের মোবাবিলা করতে বিশ্বের কাছে আবেদন উঠেছে। কারণ এই ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীনের উহান অঞ্চলের এক মাছ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। তবে চীন বিশ্বকে দেখিয়েছে কিভাবে এই ভয়াবহ ভাইরাসের সাথে লড়াই করে এর মোকাবিলা করতে হয়। এ দেশের ভাইরাস মোবাবিলায় লকডাউনে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল। তাই আক্রান্তের সংখ্যা হু হু করে বাড়ার আগেই সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতে সফল হয়। জনসংখ্যার তুলনায় এখানে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার একেবারেই সামন্য। চীনে আক্রান্তের সংখ্যা ৮২,০০০ এটা সেখানকার জনসংখ্যার ০.০০৫ শতাংশ মাত্র।
বাংলাদেশে এখন লকডাউন চলছে। সকল মানুষ কাজের জায়গা বা কর্মক্ষেত্র ছেড়ে ঘরে বসে আছে। সরকারী অনুদান বা ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অসহায় নি¤œআয়ের মানুষের দিকে। এ কারণে প্রতিনিয়ত খবরের শিরনাম হতে দেখা যাচ্ছে অনেক নামধারী সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষদের। সামান্যতম প্রটেকশান নিয়ে তারা রাস্তায় বের হচ্ছে মানবতার সেবায় বা অসহায়দের সাহায্য করার জন্য। এসব ব্যক্তিগত সাহায্যকারীদের প্রায় সকলকেই দেখা যাচ্ছে ছবি তোলার জন্য মুখের মাস্ক খুলে ছবিতে পোঁজ দিচ্ছেন। ফলে, হিতের বিপরীত হচ্ছে। ওই ব্যক্তি নিজে অরক্ষিত হয়ে অন্যকে সংক্রমিত করার ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছেন। তাছাড়া আমাদের বুঝতে হবে, এটা কোন দুর্যোগ মোকাবিলা নয়। এখানে দুর্যোগের শিকার সকলেই। সেবা বা সাহায্য করার নামে যে মিছিল বের হচেছ লকডাউনের সময়। এই দায়ভার কে নেবে? হয়তো অনেকেই বলবেন, অসহায়, মানুষদের সাহায্য করতে এগিয়ে না আসলে তারা খাবে কি? একবার ভাবুন, খাবারের চেয়ে বেঁচে থাকা অনেক জরুরি। মানুষ না খেয়ে ৪ দিন থাকতে পারে। আর শুধু পানি খেয়ে ১০ দিন থাকতে পারে। আমাদের দেশে এখন আর এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার ঘরে ১৫ দিনের খাবার ব্যবস্থা করার টাকা নেই। একেবারে না খেয়ে বা শুধু পানি খেয়ে চলার মানুষ এখন আর আমাদের দেশে নেই। বাংলাদেশের কোথাও এখন আর মঙ্গাপিড়িত শব্দটি ব্যবহার করা হয় না। বাংলাদেশে লকডাউন শুরু হয়েছে মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে। এখন চলছে এপ্রিল মাস। এই লকডাউনের মেয়াদ বাড়িয়ে তা আগামী এপ্রিলের ১১ অর্থাৎ সরকারি সাপ্তাহিক ছুটি এবং নববর্ষের ছুটি মিলিয়ে সেটা দাঁড়িয়েছে ১৪ তারিখ পর্যন্ত। সরকারী কর্মচারী বা বেসরকারী ব্যাংক কর্মচারিদের বেতন না হয় মাস শেষে ব্যাংক একাউন্টে ট্রান্সফার হবে তাদের কথা বাদ দিলাম। যারা চাকরির টাকায় সংসার চালায় বা রোজকার আয়ে সংসার চালায়, তারাও না হয় বর্ধিত দিনগুলিতে জমানো টাকা বা সরকারী-বেসরকারী অনুদানে চলতে পারবে। তবে আগামী একমাস অর্থাৎ এপ্রিল শেষে মে-জুন থেকে একটা অদৃশ্য সমস্যায় পড়তে পারে আমাদের অর্থনীতি। এটা ভাবার সময় এখনই চলে এসেছে।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজা বলেছেন, ‘চরিত্রের দিক থেকে অতীতের অর্থনৈতিক সংকটের তুলনায় করোনা সংকট একেবারেই আলাদা’। এটি মুলত কোন স্বাভাবিক সংকট নয়। করোনার মহামারির প্রভাব একটি ‘অন্য ধরনের সংকট’। এটি নিছক চাহিদার সমস্যা নয়। করোনার সংক্রমণ ব্যহত করছে বিশ্বায়িত অর্থনীতি এবং সাপ্লাই চেইনকে। কারণ দেশগুলি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের সীমন্তকে। করোনা মোকাবিলায় চলছে ব্যাপক আকারের লকডাউন ও কোয়ারেন্টাইন। বহু মানুষের আয় ইতোমধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়ছে। রোগের কারণে মানুষ ব্যবসা বন্ধ করছে। মার্কিন মুলুকে, নিউইয়র্কে পর্যন্ত রোস্তোরা বন্ধ, বার বন্ধ। এয়ারপোর্ট বন্ধ, ফ্লাইট বন্ধ। এমনকি হোটেল বুকিং পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। মানুষের ব্যবাসায়িক লেনদেন বন্ধ রয়েছে। ব্যবসা নতুন করে ঋন নিতে পারছে না। কোনও ব্যাংক এই ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে রেহাই পাবে না। যে বা যারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হবেন, তাদের জন্য বিপুল পরিমান অর্থের প্রয়োজন। এমনকি অনেক কোম্পানী ব্যাংকের পুরানো ধার শোধ করতে পারছে না। নতুন করে ধার নিতেও পারছে না। যারা ভয়াবহ দুর্দশার মধ্যে রয়েছেন তাদের জন্য হেলিকপ্টার (সরাসরি) মানি দিতে হবে। তাহলে যদি অন্তত কিছুটা মোকাবিলা করা সম্ভব।
আগামী কয়েকমাসের মধ্যে বাংলাদেশে বেকার হবে অন্তত কয়েক লক্ষ মানুষ। শ্রমিকদের সম্মিলিত আয় কমে যাবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রধানের চোখে উদ্বেগ আর অসহায় আর্তনাদের চিত্র। তিনি বলেছেন, বাস্তবতা আরও ভয়াবহ হতে পারে। আমরা অতিতের সব অর্থনৈতিক মন্দার সময় দেখেছি এর প্রধান এবং প্রথম ধাক্কা লাগে মিডিয়ার উপর। এখানে কর্মরত অনেক মানুষ হয়ে পড়বে দিশেহারা। কারণ মিডিয়া নিয়ন্ত্রন বা পরিচালিত হয় ব্ল্যাক মানির মাধ্যমে। তাছাড়া এটা অনেকটা বিলসিতার মতোই। মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় সমস্যা সমাধানের পর আসে বিলাসিতার কথা। যেখানে জীবন চলে না সেখানে বিলাসিতার কথা ভাবা যায়!

আসন্ন অর্থনৈতিক সংকটে এ দেশের বোদ্ধামহলকে এখনই সজাগ হতে হবে। অতি সহজেই অল্পসময়ে যাতে এই অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা যায় সে বিষয়ে আগাম ভাবতে হবে। তা না হলে মধ্যম আয়ের দেশটি আবার সেই অতিতে নিমজ্জিত হতে পারে




Archives