বাংলাদেশে গৃহশিক্ষকের নৃশংসতার বলি হয়ে পঙ্গু হাসপাতালে ছাত্রী

প্রথম সময়: ডেস্ক নিউজ | সংবাদ টি প্রকাশিত হয়েছে : ২০. মার্চ. ২০১৯ | বুধবার

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

সাদ্দাম হোসাইন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

‘আমারে কচ্ছিল (বললো) যদি তার প্রস্তাবে রাজি হয় তাহলে আমার জন্যে গিফট আছে। আর রাজি না হইলেও গিফট আছে। রাজি না হওয়ায় আমারে গিফট দিল কোপাইয়্যা (কুপিয়ে)। আমার দাদিরেও কোপাইলো। আবার আমার সঙ্গে পড়তে বসা জুঁইরেও (ছদ্মনাম) কোপাইলো। সে (গৃহশিক্ষক) আইসায় আমার গলায় চাপাতি ধইরা সবাইরে কই, কেউ আগাইবানা (এগিয়ে আসতে মানা), আগাইলে সবাইরে শেষ কইরালামু’—এভাবেই বর্ণনা দিচ্ছিল ঘটনার শিকার ৬ষ্ঠ শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী।

প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ওই শিক্ষার্থীর পায়ের রগ কেটে দিয়েছে তারই গৃহশিক্ষক রাকিবুল ইসলাম মিঠু (২২)। সে সময় নাতনিকে বাঁচাতে গিয়ে দাদি জাহানারা (৫০) ও পাশের বাড়ির আরেক শিশু মারাত্মক আহত হয়।

পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের গ্রিন ইউনিটের মেঝেতে পাতা বিছানায় শুয়ে আছে আহত ওই স্কুলছাত্রী ও তার দাদী জাহানারা। আর বকুলকে রাখা হয়েছে শিশু ওয়ার্ডের জরুরি বিভাগে।

দাদি জাহানারা সারাবাংলাকে বলেন, “ওই দিন মাগরিবের নামাজ পড়তেছিলাম। এসময় আমার নাতিন আর পাশের বাড়ির বকুল পড়তে বসলো ভেতরের ঘরে। হঠাৎ মিঠু আইসা কয়, ‘নামাজ পইড়া লাভ নাই। আইজ সবাইরে মাইরা ফেলামু। কেউ বাঁচবার পারবো না।’ এটা বলে আমারে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দ্রুত ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেয়।”

তিনি বলেন, “আমি বাইরে থেকে অনেকক্ষণ দরজা ধাক্কাধাক্কি করলাম, খুললো না। পরে দৌড়ে গিয়ে ওই রুমের জানালা দিয়ে দেখি আমার নাতিনের গলায় সে গরুর মাংস কাটার চাপাতি ধরে রেখে বলতেছে, ‘আজ তোকে বাঁচতে দিমু না। কেউ সামনে আগাইবা না। শেষ কইরালামু সবাইরে।’ এসময় আমি নাতিনরে বাঁচাতে হাত বাড়ালেই কোপ দিয়ে আমার দুই হাতের গোড়া থেকে কেটে দেয় সে। শুধু চামড়ার সঙ্গে হাত ঝুলে ছিল। এরপর আশপাশের লোকজন এসে আমাদের হাসপাতালে নেয়।”

পাশে শুয়ে থাকা আহত শিক্ষার্থী সারাবাংলাকে বলে, ‘সে যখন আমার গলায় চাপাতি ধরছিল তখন আমি উপায় না পেয়ে জানালা দিয়ে বের হইতে ঝাঁপ দিছিলাম। এসময় সে কোপ দেয় আমার পায়ে। এরপর আরও কয়েকটা কোপ দেয় আমার পিঠে ও হাতে।’

এসময় সে হাতের ইশারায় তার আঘাতের চিহ্ন দেখাতে থাকে। আর বলে, ‘আমি ওর কাছে ক্লাস ফাইভে এক বছর প্রাইভেট পড়েছিলাম। এরপর এ বছর এক মাস প্রাইভেট পড়ার পর আর পড়িনি। সে আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়, আমি রাজি হয়নি। তাই আমাদের এ অবস্থা করছে।’

শিক্ষার্থীর মা রানু সারাবাংলাকে বলেন, ‘ক্লাস ফাইভের সমাপনী পরীক্ষা শেষে সে আমাদের মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। তখন আমরা বলছিলাম আমাদের মেয়ে এখনও ছোট, বড় হলে তখন দেখা যাবে। কিন্তু তার কথা হলো এখনই দিতে হবে। তাই এ কামডা (কাজটা) কইরলো (করলো)।’

আহত শিক্ষার্থীর বাবা রতন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি থাকি আশুলিয়া। সেখানে একটা দোকানে কাজ করি। ওইদিন সন্ধ্যা সাতটার দিকে বাড়ি থেকে ফোনে জানতে পারি আমার মেয়ে এবং মা ও পাশের বাড়ির একটা মেয়েরে এলোপাথাড়ি কুপিয়েছে প্রাইভেট মাস্টার মিঠু। এখন পঙ্গু হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা চলছে। আমি এর বিচার চাই।’

নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলা নম্বর-৫। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত মিঠুর ভাই উজ্জলকে গ্রেফতার করে। এরপর মিঠুসহ আরও তিনজন আদালতে আত্মসমর্পণ করে। এখন তারা কোর্ট হেফাজতে আছে।’

প্রসঙ্গত, গত ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় নড়াইল সদর উপজেলার হবখালী ইউনিয়নের সিংগিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আহত অবস্থায় প্রথমে তাদের সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাদের নেওয়া হয় যশোর জেলা হাসপাতালে। পরে শুক্রবার রাতে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরদিন সকালে সেখান থেকে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠান চিকিৎসকরা।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২২ বার







Archives