মধ্যরাতে সাংবাদিককে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে জেল, সংবাদ প্রকাশের জেরে এই পদক্ষেপ বলে অভিযোগ

প্রথম সময়: ডেস্ক নিউজ | সংবাদ টি প্রকাশিত হয়েছে : ১৫. মার্চ. ২০২০ | Sunday

মধ্যরাতে সাংবাদিককে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে জেল, সংবাদ প্রকাশের জেরে এই পদক্ষেপ বলে অভিযোগ

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

প্রথম সময় ডেস্ক:

ক্ষমতা বলে কথা তাই কিন্তু বিচারক না তিনি তারপরেও ঘরের দরজা কেটে
বাংলাদেশের কুড়িগ্রামে মধ্যরাতে বাড়িতে ঢুকে স্থানীয় একজন সাংবাদিককে ধরে নিয়ে গিয়ে জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।
তবে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী বলছেন, এভাবে কাউকে বাড়ি থেকে ধরে এনে সাজা দেয়া মোবাইল কোর্টের আওতার মধ্যে পড়ে না।
মাদক বিরোধী টাস্কফোর্সের অভিযানের কথা বলা হলেও শুক্রবার রাতের ওই অভিযানে একমাত্র সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম ছাড়া আর কাউকে আটক করা বা সাজা দেয়া হয়নি।
আরিফুল ইসলামের সহকর্মীরা বলছেন, জেলা প্রশাসক ও প্রশাসনের অনিয়মের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করার কারণে প্রতিশোধমূলকভাবে ধরে এনে সাজানো মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে।

তবে এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংবাদ করার কারণে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসাবে এখানে কোন ঘটনা ঘটেনি।
কী ঘটেছে কুড়িগ্রামের কারাগারের সামনে থেকে বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেন সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার নিতু। তিনি স্বামীর সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু কারাগারের কর্তৃপক্ষ তাকে জানিয়েছে, সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের সঙ্গে কারো দেখা না করতে দেয়ার নির্দেশ রয়েছে। তাই তিনি দেখা করার অনুমতি পাননি।

মোস্তারিমা সরদার বলছেন, ”শুক্রবার গভীর রাতে অনেক লোকজন এসে আমাদের বাসার দরজা খুলে দিতে বলে। একপর্যায়ে ওনারা ধাক্কা দিয়ে দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে সাত আটজন মিলে আমার স্বামীকে মারতে শুরু করে। তাদের হাতে রাইফেল, পিস্তল সবই ছিল।”

”তখন বারবার বলছিল, কয়দিন ধরে খুব জ্বালাচ্ছিস। গুলি করে দেবো। বলে আর মারে। ওর গায়ে কোন কাপড় ছিল না। আশেপাশের বাড়ির কাউকে সামনে এগোতে দেয়নি। সারা রাস্তা মারতে মারতে নিয়ে গেছে। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তাও বলেনি।”
অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পরে জানা গেল, তাকে নাকি সঙ্গে সঙ্গেই মাদকের মামলায় এক বছরের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন:
মোবাইল কোর্ট আইনের সংশোধন, অপব্যবহারের আশঙ্কা অনেকের
ফেসবুকে হুমকি দিয়ে ছাত্র জেলে, হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ হরতালে আদালতের ‘নজিরবিহীন’ ব্যবহার
সম্প্রতি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১২১টি শিশুর দেয়া সাজা অবৈধ ঘোষণা করে তাদের মুক্তি দেয়ার আদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।প্রতিশোধমূলক সাজা?

স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন, আটককৃত সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম এর আগে স্থানীয় জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সংবাদ করেছিলেন। এ নিয়ে কিছুদিন ধরে তাকে নতুন আর কোন নিউজ না করার জন্যও বলা হয়েছিল।

আরিফুল ইসলাম যে পত্রিকায় কাজ করেন, বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক হারুন উর রশীদ বিবিসি বাংলাকে বলেন ”আরিফুল ইসলাম জেলা প্রশাসকের অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সংবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে একটি হচ্ছে কাবিখার টাকায় একটি পুকুর সংস্কার করে জেলা প্রশাসক নিজের নামে নামকরণ করেছিলেন। এছাড়া কুড়িগ্রামের মোবাইল কোর্টকে যেভাবে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তা নিয়েও তিনি সংবাদ করেছিলেন।”

”আরেকটি খবরের বিষয়ে তিনি খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। সে কারণেই তাকে এভাবে আটক করে সাজা দেয়া হয়েছে।”

তিনি বলেন, ”আরিফের বাড়িতে কোন তল্লাশি চালানো হয়নি। কিন্তু জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নেয়ার পর তার বিরুদ্ধে আধা বোতল মদ আর দেড়শ গ্রাম গাজা উদ্ধারের গল্প বলা হচ্ছে। অথচ আরিফুল সিগারেটও খায় না। এ থেকেই বোঝা যায়, এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আর প্রতিশোধমূলকভাবে করা হয়েছে।”

যা বলছেন জেলা প্রশাসক

জেলা শহরের মোবাইল কোর্টগুলো জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে থাকে। এসব কোর্টের দায়িত্বও জেলা প্রশাসক নির্ধারণ করে থাকেন।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন বলছেন, ”আমাদের নিয়মিত মোবাইল কোর্ট হয়, আমরা শিডিউল করে দেই। অনেক সময় তারা মাদক, চোরাচালানের টাস্কফোর্সের অভিযানেও যায়, যেখানে ম্যাজিস্ট্রেট থাকেন। গত রাতেও এরকম কয়েকটি অভিযান চালানো হয়েছে। সেই অভিযানে ওই ব্যক্তিকে আটক করে সাজা দেয়া হয়েছে।”

জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ কারণে এই অভিযান বলে যে অভিযোগ উঠেছে, সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ”যদি ওই ঘটনাই হতো, সেটা তো একবছর আগের কথা। এখানে আমি কিছু কাজ করেছি, সংস্কার কাজ.. সেখানে ওরা বলছে যে, আমার নামে….নামের কোন লক্ষণই নেই, সেটা আলাদা বিষয়, সেখানে সে স্যরি বলেছে বলে আমরা তো আর কিছুই বলি নাই। ওইটা যদি কোন বিষয় হতো, তাহলে তো তখনি আমরা কোন অ্যাকশনে যেতাম।”

”এখন ওইটার সঙ্গে এইটা মিলাচ্ছে তারা (সাংবাদিকরা)।”

মোবাইল কোর্ট এভাবে অভিযান চালাতে পারে কিনা, জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ”আসলে অভিযানটি চালিয়েছে টাস্কফোর্স। সেখানে যদি মোবাইল কোর্টে শিডিউলভুক্ত মামলার বিষয় থাকে, সেক্ষেত্রে তারা দিতে পারে।”

বাংলাদেশে রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে কতটা কাজ হয়

কিন্তু যেভাবে একজন সাংবাদিককে মধ্যরাতে ধরে আনা, আধ বোতল মদ আর দেড়শ গ্রাম গাজার মামলায় একবছরের সাজা দেয়া, এটা বেশ নজিরবিহীন ঘটনা। তিনি তাই মনে করেন কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ”টাস্কফোর্সের টোটাল টিম বলতে পারবে, আসলে ব্যাপারটা কী? আমি তো ঘটনাস্থলে ছিলাম না।”

রাতের ওই অভিযানে আর কাউকে সাজা দেয়া হয়নি বলেও তিনি জানান।

তাহলে কি শুধুমাত্র একজনকে লক্ষ্য করেই অভিযান চালানো হয়েছে এবং তাকেই সাজা দেয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ” আমার কাছে তা মনে হচ্ছে না। তবে আমার মনে হয় রেগুলার মামলা হলে ভালো হতো।”

যে ম্যাজিস্টেট এই সাজা দিয়েছেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। তবে পরবর্তীতে তিনি আর টেলিফোন ধরেন নি।

কুড়িগ্রাম থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, এ ধরণের অভিযানের ব্যাপারে তাদের কাছে কোন তথ্য ছিল না।

মোবাইল কোর্টের অপব্যবহার?

সম্প্রতি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১২১টি শিশুর দেয়া সাজা অবৈধ ঘোষণা করে তাদের মুক্তি দেয়ার আদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলছেন, মোবাইল কোর্টের আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, মোবাইল কোর্ট কখন গঠন করা যাবে, কখন সাজা দেয়া যাবে।

সেখানে বলা হয়েছে, যদি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এরকম কোন অপরাধ সংঘটিত হয়, তাহলে তিনি তাক্ষণিকভাবে সাজা দিতে পারবেন। কিন্তু আপনি যদি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নিয়ে এসে বলেন, সে এই অপরাধ করেছে, সেক্ষেত্রে তার সাজা দেয়ার সুযোগ নেই।

”মোবাইল কোর্ট গঠন করার যে প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি আছে, সেখানে গভীর রাতে বাসায় গিয়ে এভাবে মোবাইল কোর্ট করে সাজা দেয়ার সুযোগ নেই। যে প্রক্রিয়ায় এটা করা হয়েছে, তা মোবাইল কোর্টের একটি অপব্যবহার বলেই আমার মনে হচ্ছে।” বলছেন মি. মোরশেদ।

তিনি বলছেন, ”মোবাইল কোর্টের যে অপব্যবহার হচ্ছে, তা নিয়ে হাইকোর্ট কিন্তু বেশ কয়েকটি ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেছে এবং যারা মোবাইল কোর্ট করেন, তাদের সতর্ক করা হয়েছে এবং সাজাগুলো বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে।”

মি. মোরশেদ বলেন, তার ধারণা যেভাবে কুড়িগ্রামের সাংবাদিককে আটক করে নিয়ে সাজা দেয়া হয়েছে, হয়তো তার পেছনে হয়তো অন্য কোন বিরোধ আছে।




Archives