সরকার কেন গ্রামীণফোনের উপরে প্রচারণা নিয়ে নিষেধাজ্ঞা কেন?

প্রথম সময়: ডেস্ক নিউজ | সংবাদ টি প্রকাশিত হয়েছে : ১৯. ফেব্রুয়ারি. ২০১৯ | মঙ্গলবার

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

সোহাগ সামী:

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা – বিটিআরসি দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনকে সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার বা এসএমপি ঘোষণা করার পর এবার প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে।

বিটিআরসির সহকারী সিনিয়র পরিচালক জাকির হোসেন খান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, নতুন এ সিদ্ধান্ত পহেলা মার্চ থেকে কার্যকর হবে এবং এজন্য গ্রামীণফোনকে করণীয় কিংবা বর্জনীয় সম্পর্কে ১৫টি বিষয় জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

গ্রামীনফোন জানিয়েছে, তারা বিটিআরসির নির্দেশনা পেয়েছে তবে তারা মনে করে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন কিংবা বিনিয়োগ করার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করা উচিৎ নয়।

সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার – এসএমপি কী

নতুন প্রবিধান অনুযায়ী তাৎপর্যপূর্ণ বাজার ক্ষমতা, একক বাজার হিস্যা, ষড়যন্ত্র কিংবা জোট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণের জন্য পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

তাৎপর্যপূর্ণ বাজার ক্ষমতা বা এসএমপি হলো কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারে কতটা প্রভাবশালী। টেলিকমের ক্ষেত্রে গ্রাহক, রাজস্ব ও তরঙ্গ ব্যবহারের দিক থেকে বাজারের ৪০ ভাগেরও বেশি হিস্যা হয়ে গেলে তাকেই এসএমপি ঘোষণা করা যাবে।

প্রভাব পড়বে গ্রামীণফোনের ওপর ?

আগামী পহেলা মার্চ থেকে বিটিআরসির প্রবিধান কার্যকর হলে বেশ কিছু বিধি নিষেধের মধ্যে পড়বে দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফোন কোম্পানিটি।

এর মধ্যে রয়েছে এমএনপি লকিং পিরিয়ড ত্রিশ দিন করা অর্থাৎ অন্য অপারেটর থেকে কেউ গ্রামীণে এলে এতদিন তাকে তিন মাস গ্রামীণের সাথেই থাকতে হতো। এখন এ ধরণের গ্রাহকের জন্য গ্রামীণের লকিং পিরিয়ড হবে তিন মাসের বদলে একমাস।

টেলিকম খাতের সবচেয়ে বড় এ প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে কোনো স্বতন্ত্র ও একক স্বত্বাধিকার চুক্তি করতে পারবেনা।

আর কোয়ালিটি অফ সার্ভিস বা সেবার মানের বিষয়ে মাসে কল ড্রপের পরিমাণ হবে সর্বোচ্চ দুই শতাংশ।

আর কোনো ধরণের কোনো মার্কেট কমিউনিকেশনস অর্থাৎ মার্কেটিং সম্পর্কিত কোনো প্রচার করতে পারবেনা কোনো মাধ্যমেই।

মার্কেট কমিউনিকেশনস বলতে বোঝানো হয়েছে যে কোনো মাধ্যমে মার্কেটিং সম্পর্কিত কোন প্রচার প্রচারণা চালানো যাবেনা। যেমন -অফার বা প্যাকেজের বিজ্ঞাপন দেয়া যাবেনা। এমনকি এসএমএস করে গ্রাহকদের যেসব অফার দেয় গ্রামীণ সেটিও আর করা যাবেনা।

বিটিআরসি মুখপাত্র জাকির হোসেন খান বলছেন, “আমরা একটা মার্কেট ব্যালেন্স করার জন্য, বিশেষ করে টেলিযোগাযোগ খাতকে সুশৃঙ্খল, প্রতিযোগিতামূলক ও সবার জন্য সমান করার জন্য এ পদক্ষেপ নিয়েছি”।

গ্রামীণফোন কার্যালয়।গ্রামীণফোন কেনো এসএমপি ঘোষিত হলো ?

বাংলাদেশে টেলিকম খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন। সঙ্গত কারণেই গ্রাহক সংখ্যা ও রাজস্বের দিক থেকেও তারাই এগিয়ে আছে।

টেলিযোগাযোগ খাতে কেউ একচ্ছত্র ব্যবসা মূলত এই প্রতিষ্ঠানটির হাতে। আর সেটি নিয়ন্ত্রণের জন্যই এমন পদক্ষেপ নিয়েছে বিটিআরসি।

এর অংশ হিসেবেই গত নভেম্বরে সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার বা তাৎপর্যপূর্ণ বাজার ক্ষমতা (এসএমপি) প্রবিধান ঘোষণা করে বিটিআরসি।

ওই প্রবিধানের ৭/১১ ধারা অনুযায়ী, তিনটি নিয়ামকের একটি যদি ৪০ ভাগের বেশি থাকে তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান এসএমপি ঘোষিত হবে।

নিয়ামক বা ক্যাটাগরি তিনটি হলো- গ্রাহক, অর্জিত রাজস্ব ও তরঙ্গ।

এরপর গত ১০ই ফেব্রুয়ারি গ্রামীণফোন বা জিপি কে এসএমপি ঘোষণা করা হয়, কারণ জিপির গ্রাহকসংখ্যা মোট গ্রাহকের ৪০ ভাগের বেশি।

এছাড়া অর্জিত রাজস্ব আয়ের দিক থেকেও বাজারের মোট রাজস্বের ৪০ ভাগের বেশি এই কোম্পানিটির।

তবে তরঙ্গ ব্যবহারের দিক থেকে কোনো কোম্পানিই ৪০ভাগ অতিক্রম করতে পারেনি। তাই গ্রাহক ও রাজস্ব আয়ের ভিত্তিতে এসএমপি ঘোষণা করা হয় গ্রামীণফোনকে।

জানা গেছে, বাংলাদেশে এখন মোবাইল ফোনের গ্রাহক সংযোগ আছে ১৫ কোট ৩০ লাখের মতো এবং এর মধ্যে ৪৬ শতাংশই গ্রামীণফোনের। আর মোট রাজস্বের ৫০ ভাগেরও বেশি নরওয়ের এই কোম্পানিটির।

এরপর গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি এসএমপির ক্ষেত্রে করণীয় বর্জনীয় ১৫টি বিষয়ে আলোকপাত করে বিটিআরসি চিঠি দেয় তাদের।

বিটিআরসি মুখপাত্র জাকির হোসেন খান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, প্রবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের পর থেকে তারা ব্র্যান্ডিং করতে পারবে তবে কোনো মাধ্যমে কোনো ধরনের মার্কেটিং কমিউনিকেশনস চালাতে পারবেনা।

সেটি লঙ্ঘন হলে বিটিআরসি আইন অনুযায়ী জরিমানাসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা রাখে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গ্রাহক ও বার্ষিক রাজস্বকে বিবেচনায় নিয়েছে বিটিআরসি।প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন কিংবা বিনিয়োগ ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করা উচিৎ নয় – গ্রামীণফোন

বিটিআরসির প্রবিধান অনুযায়ী, এসএমপি ঘোষণা ও করণীয়-বর্জনীয় যেসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে গ্রামীণফোনের সাথে যোগাযোগ করেছে বিবিসি বাংলা।

গ্রামীনফোনের পক্ষ একটি লিখিত বিবৃতি পাঠিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কমিউনিকেশনস বিভাগের কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসান।

এতে বলা হয়েছে, “আমরা বিটিআরসি’র নির্দেশনা পেয়েছি এবং মূল্যায়ন করে দেখছি। এটা স্পষ্ট যে, চিঠিতে গ্রামীণফোনের আধিপত্যের অপব্যবহারের ব্যাপারে কোনো প্রস্তাবনা নেই।”

“আমরা প্রচলিত আইন ও আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম অনুশীলনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ প্রতিযোগিতা কাঠামোকে সমর্থন দেই।”

তবে, এ ধরনের নির্দেশনার মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন কিংবা বিনিয়োগ করার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করা উচিৎ নয়; এমনকি, যেখানে বাজার ক্ষমতার অপব্যবহারের কিংবা যৌথ আধিপত্যের অপব্যবহার করার কোনো বিষয় নেই বলে জানানো হয়েছে ওই বক্তব্যে।

‘রোগের কারণ উপেক্ষা করে রোগ নিরাময়ের চেষ্টা’

টেলিকম খাতের বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদ খান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, টেলিযোগাযোগ খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আমলে না নিয়ে শুধু খুচরা ব্যবসার অংশ আলাদা করে দেখলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবেনা।

তার মতে, সামগ্রিকভাবে পুরো খাতকে বিবেচনায় আনতে হবে যে সবক্ষেত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতা বিরাজ করছে কিনা।

“কারণ সরকারের উদ্দেশ্য ভালো কিন্তু সেটি বাস্তবায়নে দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে ইনক্লুসিভ। খুচরা ও পাইকারি উভয় ক্ষেত্রেই তীব্র প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”

মিস্টার খান বলেন, যেসব বাজারে কোনো একজন অপারেটর অনেক বেশি মার্কেট শেয়ার দখল করে ফেলে তার হ্রাস টেনে ধরা হয়।

এখানে বিটিআরসি যে পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে বলছে জিপির মার্কেট শেয়ার ৪০ বেশি সে কারণে তার ব্যবসা সম্প্রসারণে এ বাধা দেয়া হচ্ছে।

“কিন্তু রোগের কারণ নিয়ে কথা বলা উচিত। বিটিআরসি শুধু রোগের নিরাময় চেষ্টা করছে রোগের কারণ উপেক্ষা করে”।

তিনি বলেন, গ্রামীণফোন একমাত্র কোম্পানি যারা সারাদেশে সঞ্চালনের জন্য ভৌত অবকাঠামো অর্থাৎ অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক আছে যেটা সে ৯৭ সালে রেলওয়ের কাছ থেকে নিয়েছিলো।

পরে এটা সম্প্রসারণ করা হয় কিন্তু অন্য অপারেটররা সে সুযোগ পায়নি। ফলে টেলিযোগাযোগ খাতে অসম পরিস্থিতি তৈরি হয়।

“সরকারের উচিত ছিলো এ অস্বাভাবিকতা দূর করে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করা। সেটি হয়নি বলেই একটি কোম্পানি বেশি সুবিধা নিয়ে এগিয়ে গেছে।”

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “ব্যবসা পরিচালনায় জিপির খরচ অন্যদের তুলনায় অনেক কম”।

 

 

 

 

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১১৯ বার




Archives