শুভজন্মদিন সুপারম্যান

প্রথম সময়: ডেস্ক নিউজ | সংবাদ টি প্রকাশিত হয়েছে : ৩০. সেপ্টেম্বর. ২০১৯ | সোমবার

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

প্রথম সময় ডেস্ক;

 

এই শহরে এক সুপারম্যান এসেছিল। এ কথাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় সময় চোখে পড়ে। স্মৃতিতে যেন তিনি অমলিন। সুপারম্যানের চমক এ শহরের মানুষেরা এখনো খুবই মিস করেন। করাটাই স্বাভাবিক। নাগরিক জীবনের বিপর্যয় যেখানে ছিল, ছুটে গিয়েছিলেন সেখানেই। দিবা-রাত্রি তিনি নাগরিকদের জীবন যাত্রার মান উন্নত করার জন্য কাজ করে গেছেন। ঢাকা শহরকে মানবিক করার জন্য দৌড়ঝাঁপ করেছেন। যানজট তো আমাদের নিত্যসঙ্গী। আর জলজট হলে তো সীমাহীন দুর্ভোগ!

এই সুপারম্যান জলজট দূর করতে খালগুলো উদ্ধারে এক বুক সাহস নিয়ে খালখেকোদের মুখোমুখি হতে যেতে থাকলেন অলিগলিতে। খেকোদের কে কতো প্রভাবশালী, সে দিকে ছিল না তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ! কাউকে ছেড়ে কথা বলেননি। রাস্তা দখল করে গড়ি রেখে নাগরিক জীবনে বিড়ম্বনা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধেও যেন বিনা অস্ত্রতে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন! এর ফলশ্রুতিতে অবাক বিস্ময়ে ঢাকা উত্তরের জনগন দেখলো কারওয়ানবাজার থেকে  সাতরাস্তার সংযোগ রাস্তাটা কতটা প্রশস্ত। মিরপুরের শ্যামলী, কল্যাণপুর থেকে গাবতলী ব্রিজ পর্যন্ত তিনি রাস্তাকে দখলমুক্ত করলেন অনেকটা সাহসী বীরের মতো।

রাস্তার যানজট দূর করতে হবে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সময় অপচয় হচ্ছে, এর সমাধান কোথায়? নগরের তামাম নগর পরিকল্পনাবিদদের নিয়ে পরিকল্পনা করলেন। ইউলুপ তৈরি উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু এর জন্য চাই জায়গা। সিটি করপোরেশনের এত জায়গা কোথায়? কোনটি রেলওয়ের, কোনটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের? অচিহ্নিত, অমিমাংসীত এসব বিষয়ের সঠিক সমাধান বের করতে নিজে নিজে ফাইল নিয়ে দৌড়ালেন। ইউলুপের কাজ শুরু হবে। নগর হবে যানজটমুক্ত। সুপারম্যানের কোনো ক্লান্তি যেন নেই! কী আশ্চর্যের ব্যাপার। টেলিভিশনের সুবাদে নগরবাসীরাও এসবের অনেক কিছুই দেখেছে। এমন নগরপিতার গল্পটা যেন কল্পলোকের মতোই।

চোখ মেলে ঢাকার আকাশ দেখা যেত না। বিশাল আকৃতির বিলবোর্ডগুলো ঢেকে দিয়েছিল খোলা আকাশ। তিনি ঘোষণা দিলেন ঢাকার আকাশকে তিনি ঢেকে রাখতে দেবেন না। কত যে বাধা, বিপত্তি! সুপ্যারম্যান নিজেই মধ্যরাতে বিলবোর্ড ভেঙে ফেলতে শুরু করলেন। আমরা এখন ঢাকার উন্মুক্ত আকাশ দেখি। এখন আর খবরের কাগজের শিরোনাম হয় না, ‘বিলবোর্ড ভেঙে দুইজন পথচারী নিহত!’

শহরের ময়লা আবর্জনা থেকে শুরু করে নোংরা মন মানসিকতার অধিকারী মানুষদের বিরুদ্ধেও কার্যক্রম হাতে নিলেন। মধ্যরাতে খবর পেলেন যে, কোন মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে সেখানেও তিনি ছুটে গিয়েছেন। কীভাবে ঢাকা নারীদের জন্য নিরাপদ হবে, এই নিয়ে শুরু করলেন কাজ। শহরের অপরাধ কমিয়ে আনতে হবে, কিন্তু কীভাবে? নগরপিতা ঢাকা উত্তরকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার জন্য কাজে নেমে গেলেন। বেসরকারি-পেশাজীবি সংগঠন ও বিভিন্ন এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সহায়তায় বিভিন্ন এলাকাতে সিসি ক্যামেরা বসানোর ব্যবস্থা নিলেন।

ঢাকার তাপমাত্রা অনেক বেশি। তিনি অনুভব করলেন ঢাকাকে সবুজায়ন করতে হবে। এর জন্য কর্মসূচি হাতে নিলেন। আমরা দেখতে পেলাম ফুট ওভারব্রিজ থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন জায়গাতে সবুজের অপরূপ দৃশ্য। তাই নয়, সুপারম্যান দেখলেন শহরের পরিবহন খাতকে সুশৃঙ্খল করতে হবে। পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে। পুরোনো লক্করঝক্কর বাস আর চলবে না। শীতাতপ বাস চালু করা হবে। ব্যাংক থেকে অল্প সুদে যেন বাস মালিকেরা এই শীতাতপ নতুন বাসগুলো আনতে পারে, এজন্য তিনি দিনের পর দিন মিটিং আর সমাবেশ করলেন। ঢাকাবাসী দেখলো সুপারম্যানের একের পর এক জাদুর চমক!

সুপারম্যান ফুটপাতকে নাগরিকেদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। আমরা এক বছরের মধ্যেই দেখলাম অপরূপ সৃদৃশ্য ফুটপাত। প্রভাবশালী যারা রাস্তার ফুটপাত বা রাস্তা দখল করে বাড়ির সীমানা প্রাচীর করেছিলেন, তিনি নোটিশের পর নোটিশ দিয়ে তা ভেঙে দিলেন। পথচারীরাও এতে যেন আনন্দিত হলো!

আর কতো বলবো এই সুপারম্যানকে নিয়ে। হিরক মর্যাদা তো নগরবাসী দিয়েই দিয়েছেন প্রথম বছরেই তাঁর কাজ দেখে।

এবার আমি আমার কিছু কথা বলি। এতক্ষণ যাকে নিয়ে কথা বললাম, তিনি আনিসুল হক। তাঁকে আমি চিনতাম, টেলিভিশনের সফল উপস্থাপক হিসেবে। কতটা সফল? টিভি পর্দায় তাঁকে দেখলেই অনেকের মতোই আমার চোখ স্থির হয়ে যেত। আর এমন মানুষটিকে সরাসরি দেখার সুযোগ হলো প্রথম আলোতে সাংবাদিকতা করার সুবাদে। অমায়িক তাঁর ব্যবহার। আচ্ছা, একজন মানুষ সবসময় হাসি ধরে রাখেন কেমন করে? এমন প্রশ্নটি নিজে নিজে করতাম। যখন তিনি কথা বলতেন, তাঁর শব্দচয়ন, ভঙ্গীমা যেন কবির লেখা কবিতার লাইনের মতো।

২৭ নভেম্বর ২০১৩। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতো খবরের কাগজের পৃষ্ঠাগুলোতে নজর  বুলাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি ‘আরো নতুন ১১টি টিভি চ্যানেলের অনুমোদন’ এর সংবাদ। দেখলাম ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হক ‘জাদু’ নামে একটি লাইসেন্স পেয়েছেন। অভিনন্দন জানাতে ফোন করলাম। অভিনন্দন বলতেই সেই অট্টহাসি। জানতে চাইলেন, কোথায় আছি এখন? আমি বললাম, এশিয়ান টিভি তো কয়েকদিন আগে ছেড়ে দিয়েছি। বললেন, আগামীকাল চলে এসো।

পরদিন দেখা করলাম। নানারকম গল্প করলেন। এভাবে মাঝে মধ্যেই টিভি নিয়ে হতো আলোচনা। বেশ আগ্রহ নিয়ে তিনি কথা শোনেন। দেখলাম তিনি যতোটা না বলেন, তারচেয়ে বেশি শোনেন। ডিসেম্বরের ২ তারিখে বললাম, ‘আনিস ভাই আমাকে জানুয়ারির ১ তারিখের মধ্যে কোথাও না কোথাও যোগ দিতে হবে। আমার কী আপনার এখানে কোন সুযোগ হবে? আনিসুল হক আমার চোখের ওপর দৃষ্টি দিয়ে বললেন, ‘তোমাকে নিয়ে যদি ইতিবাচক ভাবনা না ভাবতাম, তবে প্রথমদিনের পরদিন আর তোমার সঙ্গে বসতাম না।’

৩ ডিসেম্বর। সাত সকালে ফোনে ক্ষুদে বার্তা এল। সকাল ১০টার সময় আমি যেন মোহাম্মদী গ্রুপে উপস্থিত থাকি। যথা সময়ে উপস্থিত হলাম। পরিচয় করিয়ে দিলেন স্ত্রী রুবানা হকের সঙ্গে। এরপরে ছেলে নাভিদুল হক এবং ছোট মেয়ে তানিশা হকের সঙ্গে। রুবানা হক কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। চেষ্টা করলাম উত্তর দিতে। আনিসুল হক শুনলেন। তারপর এভাবেই কেটে গেল আরো কয়েকটি দিন। কখনো তাঁর বনানীর বাসায় কখনো বা অফিসেই ডাকলেন। আমি যেতাম একটার পর একটা হোমওয়ার্কের মত কাগজপত্র নিয়ে। অবশেষ ১২ ডিসেম্বর রুবানা আপা আমাকে বললেন, ‘ আমরা তোমাকে নিচ্ছি। তোমাকে উনি (আনিসুল হক) পছন্দ করেছেন। তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে ছোট ভাই অথবা সন্তানের মত। চোখ দিয়ে পানি চলে এল। আনিসুল হক যোগ দিলেন আলাপচারিতায়।

সব কিছু যেন স্বপ্নের মত মনে হল। দেখলাম, যে অফিসে আনিসুল হকের সামনে কথা বলতে সবাই দুইবার চিন্তা করে, সেখানে আমি অবলীলায় কথা বলি তাঁর সঙ্গে।

বললেন, ‘ তোমার আগ্রহের কারনেই টিভিটা করছি। হয়তো আরো পরে করতাম।’ তারপর শুরু হল টিভি নিয়ে কাজ। প্রায়ই কোন না কোন কারণে টিভি নিয়ে আলোচনা করতে কখনো কলকাতা, কখনো দিল্লী যাওয়া শুরু করলাম আনিসুল হকের সঙ্গে। ভারতের বিভিন্ন টিভি স্টেশনে স্টুডিও ঘুরলেন আমাকে নিয়ে। উদ্যোক্তার সঙ্গে চলাফেরা করছি, আমি তাঁর কর্মচারী, কিন্তু কোথাও তিনি আচরণে তা প্রকাশ করেন না। নিজ হাতে বুফে থেকে খাবার নিয়ে এসে দেন আমাকে। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। আর রাতের বেলা, সুপারম্যান তাঁর জীবনের বেড়ে ওঠা দিনগুলো নিয়ে গল্প করতেন । মন্ত্রমুগ্ধ হয়েই সেসব গল্প শুনতাম।

তারপর টিভির নাম নিয়ে কতই না তাঁর আগ্রহ। লোগো কী ভাবে হবে? কে করবে? এর কী ডিজাইন হবে, কী করলে লোকে টিভি দেখবে এই নিয়ে গবেষণা, জরিপ চলতে থাকলো। টিভি ষ্টেশনের অফিস কোথায় হবে, তা নিয়ে কত না চিন্তা ভাবনা। ঢাকা শহরের এক মাথা থেকে শুরু করে আরেক মাথা চষে বেড়ালেন। নিজে একা কোন সিদ্ধান্ত নেন না তিনি। যাই করবেন, তাতে স্ত্রী, মানে আমাদের সবার প্রিয় রুবানা আপার সম্মতি থাকতে হবে। আমাকে তো একদিন বললেন, ‘ বাবু যাই সিদ্ধান্ত নেইনা কেন , বস্ কিন্তু রুবানা হক। অতএব তাকে আগে কনভিন্স করতে হবে।’ সত্যি তাঁদের দাম্পত্য জীবন যে কতটা সুখময় দেখেছি, তা সচরাচর দেখি না।  এত সুন্দর তাঁদের বোঝাপড়া যা ভাষায় বলে প্রকাশ করা সম্ভব হবে না।

একদিন কলকাতাতে বসে খবর পেলাম আমার মেঝ মেয়ে প্রাপ্তি অসুস্থ। তিনি পাশে থেকে ফোনে আমার আলাপচারিতা শুনেই আমাকে নিয়ে ফ্লাইট পরিবর্তন করে দ্রুত দেশে ফিরে এলেন। তার পরেরদিন রুবানা আপাকে দিয়ে খোঁজ নেওয়ালেন। সব শুনে বললেন, ‘কলকাতাতে নিয়ে যাও।’ আমার পরিবারের সবার যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ বাবদ টাকা তুলে দিলেন রুবানা আপা। এর পরে কলকাতা থেকে ফিরে এসে, সব জানালাম। আনিসুল হক আমাকে সেই সব রিপোর্ট নিয়ে আমাকেসহ দিল্লীতে নিয়ে গেলেন। মেদান্তা হাসপাতালে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলানোর ব্যবস্থা করলেন। সেখান থেকে দেশে ফিরে এসে বললেন, ‘তোমার বাচ্চার চিকিৎসা ঠিকঠাক মত করাতে হবে। তুমি বাচ্চাকে নিয়ে থাইল্যান্ড চলে যাও।’ আমি ঢোক গিললাম। এত টাকা কোথায় পাবো, মনে মনে ভাবলাম।। তিনি হেসে বললেন, ‘চিন্তা করবো না। সব হয়ে যাবে।’ এক সকালে রুবানা আপা ডেকে আবারো  চেক ধরিয়ে দিলেন। যেদিন আমি থাইল্যান্ডে যাবো, সেদিন অফিস এর অ্যাকাউন্টস বিভাগ থেকে আমাকে ডেকে বলা হলো চেয়ারম্যান সাহেব আপনার জন্য কিছু টাকা রেখে গেছেন। এগুলো নিয়ে যাবেন। আমি বাকরুদ্ধ। এই যুগে নিজের আত্মীয়স্বজনরা কেউ এতটা করে কী না জানি না, রক্তের কোন সম্পর্ক নেই, কিন্তু তিনি আমার জন্য যা করলেন, সত্যি সাত কপালের সৌভাগ্য আমার। এক অসম্ভব মায়া আর ভালবাসার ঋণে আবদ্ধ হলাম।  মেয়ের চিকিৎসা হল। জানিনা এমন মালিক আর কয়জন পেয়েছে। কিন্তু আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে পেয়েছিলাম এমন এক সুপারম্যানকে, যেমনটা ঢাকাবাসী পেয়েছিল তাদের সুপারম্যানকে।

ভাল ফুল বাগানে বেশিক্ষণ থাকে না। কেউ না কেউ তাকে আগে ভাগে নিয়ে যায়। আমাদের সুপারম্যানকে সৃষ্টিকর্তা নিয়ে গেছেন তার নিজের কাছে। যেখান থেকে এই সুপারম্যান আর  কোনদিন আসবে না।

মাঝে মাঝে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি, সুপারম্যান বোধহয় ওপর থেকে সব দেখছেন। সাদা মেঘের ওপরে ভেসে বেড়াচ্ছেন। দেখছেন তাঁর ঢাকা এখন কেমন আছে? রাতের আকাশে যখন দূর আকাশের পানে তাকিয়ে দেখি এক একটা তাঁরা ছুটে বেড়াচ্ছে, তখন মনে হয় আমাদের সুপারম্যান ছুটে বেড়াচ্ছেন।

এই সুপারম্যান আর আসবে কি না জানি না। তিনি চলে গেছেন, রেখে গেছেন কত শত স্মৃতি। আনিসুল হক চলে যাওয়ার পরে তাঁকে নিয়ে লেখার চেষ্টা করেছি, পারি নি। আজ কিছুটা চেষ্টা করলাম। সুপারম্যানকে (আনিসুল হক) নিয়ে বাকী গল্পগুলো হয়তো লিখবো অন্য কোন একদিন।

আজ আমাদের প্রিয় সুপারম্যান এর জন্মদিন। সুপারম্যান আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। আপনি যেখানেই থাকুন, ভাল থাকুন, আপনার আদর্শে আবারো কোন এক সুপারম্যান ফিরে আসুক আমাদের এই প্রিয় শহরে। ঢাকাকে তিলোত্তমা নগরীতে গড়ে তুলুক। তাঁর জন্মদিনে আজ এইটুকু তো চাইতেই পারি।

 

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৯ বার




Archives