চীন কি এশিয়ার পানির কল বন্ধ করে দেবে

প্রথম সময়: ডেস্ক নিউজ | সংবাদ টি প্রকাশিত হয়েছে : ২৪. ডিসেম্বর. ২০২০ | বৃহস্পতিবার

চীন কি এশিয়ার পানির কল বন্ধ করে দেবে

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

প্রথম সময় অনলাইন ডেস্ক:

চীন কি এশিয়ার পানির কল বন্ধ করে দেবে
ইয়াংজি নদীতে তৈরি হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঁধফাইল ছবি

কোভিড-১৯–এর কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা অবস্থা যখন একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছে, ঠিক এমন এক সময়েও চীন এ অঞ্চলে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টির আয়োজন করছে। বিভিন্ন নদীতে বাঁধ দিয়ে এবং কৃত্রিম জলাধার বানিয়ে পানি আটকে রাখার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এতে বিভিন্ন স্থানে পানির অভাব দেখা দেবে এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এসব প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প হিসেবে চীন ইয়ারলুং জাংবো নদীতে (যেটি ভারতীয়দের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদ হিসেবে পরিচিত) এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় বাঁধ তৈরি করছে।

চীন এশিয়ার পানি মানচিত্রের ওপর প্রাধান্য ধরে রেখেছে। চীনের জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রদেশ জিনজিয়াং এবং পানিসম্পদে সমৃদ্ধ ভূখণ্ড তিব্বতের পানিকে চীন তার ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছে। দক্ষিণ চীন সাগরে এবং হিমালয় অঞ্চলে চীন তার সীমানা সুযোগ পেলেই বিস্তৃত করে যাচ্ছে। এমনকি ভুটানের মতো একটি ছোট্ট দেশকেও তারা ছাড়ছে না। ভুটানের পানিকে নিজের দিকে নেওয়ার জন্য সেখানে তারা দখলদারি করছে। থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, নেপাল, কাজাখস্তান ও উত্তর কোরিয়ার মতো বন্ধুপ্রতিম অথবা দুর্বল দেশকেও সীমানা ইস্যুতে চাপের মধ্যে রাখে চীন। আসলে চীন তার ১৮টি প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে পানিসম্পদবিষয়ক আধিপত্য প্রদর্শনে বিন্দুমাত্র ইতস্তত করে না।

বিজ্ঞাপন

এই প্রস্তাবিত বাঁধ বাস্তবায়িত হলে চীনের ভাটির অঞ্চলের দেশগুলো পানিসংকটে পড়ে যাবে। এর আগে আমরা চীনের বাঁধের কারণে ভারতের অরুণাচল ও হিমাচল প্রদেশে আকস্মিক বন্যা হতে দেখেছি

এর ফল মারাত্মক হয়ে দেখা দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ধমনিপ্রবাহ হিসেবে পরিচিত মেকং নদীতে ১১টি বৃহৎ বাঁধ দিয়েছে, যার ফলে ভাটি অঞ্চলের দেশগুলোর নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। জিনজিয়াং থেকে উৎপন্ন হওয়া ইলি ও ইরতিশ নদীর পানির প্রবাহ চীন কৃত্রিমভাবে ঘুরিয়ে দিয়েছে। ইলি নদীর পানিপ্রবাহ ঘুরিয়ে দেওয়ার কারণে কাজাখস্তানের বলখাস হ্রদ অচিরেই আরেকটি অরল সাগরে পরিণত হবে। অরল সাগর গত চার দশকে শুকিয়ে শেষ হয়ে গেছে।

একইভাবে চীন ভারতের দিকে প্রবাহিত হয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদে এখন বৃহৎ বাঁধ দিতে যাচ্ছে এবং তার প্রস্তুতি হিসেবে সীমান্তে সেনা মোতায়েন করছে। পরিকল্পনাধীন ৬০ গিগাওয়াটের এই প্রকল্পের কাজ আগামী জানুয়ারিতে চীনের পরবর্তী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যুক্ত হবে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঁধ চীনের ইয়াংজি নদীতে রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত নতুন বাঁধ এটির চেয়েও অনেক বড় হবে। ইয়াংজি নদীর বাঁধে যে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তার চেয়ে তিন গুণ বিদ্যুৎ এখানে উৎপাদিত হবে।

চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎ কোম্পানি পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের চেয়ারম্যান ইয়ান জিয়োং প্রস্তাবিত ব্রহ্মপুত্র বাঁধকে চীনের জন্য ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাঁদের সেই ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ ভারতের জন্য বিধ্বংসী হয়ে উঠবে। ভারতে পতিত হওয়ার আগে ব্রহ্মপুত্র হিমালয় থেকে যত নিচে নামছে, তা আমেরিকার গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের দ্বিগুণ। এটিই এশিয়ার সবচেয়ে বড় বাধাহীন পানির উৎস।

অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এ প্রস্তাবিত বাঁধ বাস্তবায়িত হলে চীনের ভাটির অঞ্চলের দেশগুলো পানিসংকটে পড়ে যাবে। এর আগে আমরা চীনের বাঁধের কারণে ভারতের অরুণাচল ও হিমাচল প্রদেশে আকস্মিক বন্যা হতে দেখেছি।

চীন ইতিমধ্যে ব্রহ্মপুত্রের গতিপথে ছোট ও মাঝারি আকারের ডজনখানেক বাঁধ দিয়েছে। কিন্তু তারা এখন যে মেগা প্রকল্প করতে যাচ্ছে, তা ভয়ংকর প্রভাব ফেলবে। অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে চীন দাবি করে আসছে। তাইওয়ানের চেয়ে আয়তনে তিন গুণ বড় এ হিমাচল প্রদেশের মালিকানার দাবি আবার চাঙা হবে। এ নিয়ে আবার উত্তেজনাকর অবস্থার সৃষ্টি হবে।

এ বাঁধের কারণে শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, বাংলাদেশের স্বাদু পানির সবচেয়ে বড় উৎস এ ব্রহ্মপুত্র। ব্রহ্মপুত্র মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হলে তা তিব্বতের ওপর আঘাত হানবে। এটি তিব্বতের ভূপ্রাকৃতিক আবহই পাল্টে দেবে। এর বাইরে চীনের অভ্যন্তরীণ মানুষও এ বাঁধের কারণে ঝুঁকিতে পড়বে। কখনো এ বৃহৎ বাঁধ যদি ভেঙে যায়, তাহলে ভাটিতে বসবাসরত লাখ লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে মারা যাবে।

তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, চীন এসব দিক বিবেচনা করছে না। চীনের ক্ষমতাসীনরা আধিপত্য বিস্তারের নেশায় বিভোর হয়ে আছে। এ ঘোর থেকে তাঁদের বের করে আনতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সোচ্চার হতে হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

● ব্রহ্ম চেলানি দিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ-এর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক




Archives