আজ বিশ্ব মে দিবস শ্রমিমের গ্রীষ্মের এক তপ্ত রোদের দিন।

প্রথম সময়: ডেস্ক নিউজ | সংবাদ টি প্রকাশিত হয়েছে : ০১. মে. ২০১৯ | বুধবার

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

 নির্বাহী সম্পাদক:

 

 

 

বাংলাদেশ সহ বিশ্বের যে কোন দেশে কৃষিক্ষেতে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করছেন নারীরা। প্রত্যেকের কাজ ও কর্মঘন্টা সমান। শুধু

মজুরিতে তফাৎ। পুরুষের তুলনায় মজুরি কম পাচ্ছেন নারীরা। বছরের পর বছর এই বৈষম্য। তাতে কোনো আক্ষেপ নেই নারীদের। এই কম মজুরিই তাদের বেঁচে থাকার সম্বল। নারীদের ঘরে বাইরে সবখানেই সামলাতে হচ্ছে।কৃষিকাজে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে গ্রামে সমালোচনাও সইতে হয়। পাশাপাশি পুরুষদেরও যে তীর্যক মন্তব্য আছেসেটি অস্বীকার করা যাবে না। বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সংসারের হাল ধরেছেন নারীরা।

বলছিলাম যশোর সদর উপজেলার লেবুতলা গ্রামের নারী কৃষি শ্রমিকদের কথা। এই গ্রামের অন্তত ১০জন নারী পুরুষের পাশাপাশি কৃষি ক্ষেতে দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

জোসনা বেগম (৫০)। কলেজ পড়ুয়া দুই কন্যা সন্তানের জননী। তিন বছর আগে স্বামী হারিয়েছেন। পুরো সংসারের হাল তার কাঁধেই। কিন্তু পাঁচ শতকের ভিটে জমি ছাড়া সম্বল নেই। পরের ক্ষেতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

তিনি বলেনস্বামী আবদুস সামাদ মারা যাওয়ার পর দিশেহারা হয়ে পড়ি। দুই মেয়েকে নিয়ে কি করবো। এরপর সিদ্ধান্ত নেই পরের বাড়ি আর মাঠে কাজ করবো। তিন বছরে মাঠে কাজ করছি। বড় মেয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে আর ছোট মেয়ে এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছে। আমি ছাড়া পৃথিবীতে ওদের কেউ নেই। ওদের জন্য আমার এত পরিশ্রম।

ভোরে ঘুম থেকে উঠি। পরের বাড়ি কাজ করি। সকাল সাড়ে ৬টায় মাঠে চলে আসি। বেলা দেড়টা পর্যন্ত সবজি ক্ষেতে কাজ করি। মজুরি পাই ২শ টাকা। পুরুষের সাথে একই জমিতে সমান কাজ করি। কিন্তু মজুরির বেলায় কম পাই। কিন্তু কিছু বলি না। সব নারী কম মজুরি পায়। কাজের সুযোগ পাচ্ছিএটাই অনেক বড় ব্যাপার।

জোসনা বেগম বলেন, মেয়েরা বাড়িতে রান্নার কাজে সহযোগিতা করে। বাকী সব কাজ আমিই করি। মেয়ে দুটো লেখাপড়া শেষ করলেআমার কষ্ট আর থাকবে না। ওরা চাকরি করবে। সুদিন আসবে। ১৫ বছর আগে কৃষিকাজ শুরু করেন সেলিনা বেগম। তখন মজুরি পেতেন ৫০ টাকা। এখন পান ২শ টাকা। সময়ের ব্যবধানে তার মজুরি বেড়েছে। কিন্তু সেই মজুরি বৈষম্য এখনও আছে। বাড়ি কাজ সামলে কৃষিক্ষেতে দিনমজুরের কাজ করছেন। স্বামী আছমত আলী পেশায় ভ্যান চালক। স্বামী-স্ত্রীর উপাজর্নের টাকায় চলছে চার সদস্যের সংসার।

সেলিনা বেগম বলেন, অভাবের সংসার। স্বামীর উপার্জনে সংসার চলে না। তাই নিজেই মাঠের কাজে নেমে পড়েছি। প্রতিদিন সকালে প্রথমে সংসারের কাজ করি। সকাল ৭টার মধ্যে পরের জমিতে (সবজি ক্ষেত) কাজে চলে যাই। বেলা দেড়টায় কাজ শেষ হয়। সেখান থেকে বাড়িতে ফিরি। স্বামী সন্তানের জন্য রান্না ও অন্যান্য কাজ করি। মাঠ ও বাড়ি দুই জায়গার কাজ একাই করি। পরের জমিতে কাজ করে ২শ টাকা পাই।

পুরুষের সমান কাজ করলেও মজুরি পাই না। পুরুষের চেয়ে ১শ টাকা কম পাই। জমির মালিককে মজুরি বাড়াতে বললেবলে ‘তোমরা বিটি (নারী) মানুষবিটাদের (পুরুষ) মতো বোঝা (ভারি জিনিস) বইতে পারে?, যে তোমাদের সমান মজুরি দেব।

সেলিনা বেগম বলেনমজুরি কম পেলেও বাড়ির পাশে জমিতে কাজ করতে পারিএটাই আমাদের সুবিধা। মজুরি বেশি পেলে আমাদের খুব উপকার হতো।  আট বছরে পরে জমিতে কাজ করে সংসার চালাই। পুরুষ মানুষ বেশি কথা বলার সুযোগ পায় না। কিন্তু বাড়ির আশপাশেরকিংবা পাড়ার মহিলার পিছু কথা বলে। অনেকে উপহাস করে। তাদের কথায় কিছু মনে করি না। না খেয়ে থাকলে কেউ আমাকে দিবে না। কথাগুলো বলছিলেন তারা বানু (৪৩)। তিনি সংসারের কাজের পাশাপাশি গ্রামে অন্যের সবজি ক্ষেতে কাজ করেন। ২শ টাকা মজুরিতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শ্রম দেন।

তারা বানু বলেনপুরুষ মানুষ যে কাজ করেআমারও সেই কাজ করি। আমরা নিজের কাজ ভেবেই করি। কোনো অবহেলা করি না। অনেক সময় পুরুষরা কাজে অবহেলা কিংবা ফাঁকি দেয়। জমির মালিকরা আমাদের কাজে সন্তুষ্ট। কিন্তু মজুরি দেওয়ার সময় ঠিকই কম দেয়। বেঁচে থাকার জন্য কাজ করি। কম মজুরি দিলেও কিছু বলতে পারি না।

শুধু জোসনা বেগমসেলিনা বেগম কিংবা তারা বানু নয়তাদের মতো অনেকেই বছরের পর বছর মজুরি বৈষম্যের শিকার। তবুও তারা জীবিকার তাগিয়ে সেটি মেনে নিয়ে কাজ করছেন

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৬৫ বার




Archives