বাংলাদেশে পদের চেয়ে কর্মকর্তা বেশি, তারপরেও পদোন্নতি

প্রথম সময়: ডেস্ক নিউজ | সংবাদ টি প্রকাশিত হয়েছে : ২৭. জুলাই. ২০২০ | সোমবার

বাংলাদেশে পদের চেয়ে কর্মকর্তা বেশি, তারপরেও পদোন্নতি

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

দেলওয়ার হোসেন:

প্রশাসনে উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে আগেই। করোনাকালীন মহাসংকটের মধ্যে আবারও তিনটি পদেই প্রশাসনের জুনিয়র কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের চাপে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের দুটি ব্যাচের পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।
পদের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি কর্মকর্তা থাকার পরও গত ৫ জুন ১৩২ কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৩ ব্যাচকে অতিরিক্ত সচিব এবং ২৭ ব্যাচকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির কাজ শুরু হয়েছে। এতে অতিরিক্ত সচিব হওয়ার মতো মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যেসব সিনিয়র কর্মকর্তা পদোন্নতি পাননি তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। কারণ, পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য সিনিয়র কর্মকর্তাদের আগে পদোন্নতি না দিয়ে জুনিয়রদের পদোন্নতি দিলে বঞ্চিতদের সংখ্যা আরও বাড়বে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের সার্বিক প্রধান হলেন মন্ত্রী, প্রশাসনিক প্রধান এবং প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টিং অফিসার (অর্থবিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা) হলেন সচিব। মন্ত্রণালয়ের সচিবকে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজে সহায়তা করবেন অতিরিক্ত সচিব। ২০০৮ সাল পর্যন্ত অতিরিক্ত সচিবের পদ ছিল প্রায় ২১টি। এখন একটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগে কাজ করছেন আট থেকে নয়জন অতিরিক্ত সচিব। যেমন জনপ্রশাসনে কাজ করছেন নয়জন, মন্ত্রিপরিষদ ও স্থানীয় সরকার বিভাগে কাজ করছেন আটজন করে। অথচ অনুবিভাগের প্রধান যুগ্ম সচিব, অধিশাখার প্রধান উপসচিব এবং শাখার প্রধান সিনিয়র সহকারী সচিব বা সহকারী সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা থাকার কথা। কিন্তু পদ ছাড়া পদোন্নতি দেওয়ায় বর্তমানে প্রত্যেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শতভাগ অনুবিভাগে (যুগ্ম সচিবের পদে) কাজ করছেন অতিরিক্ত সচিব পদের কর্মকর্তারা।
স্থানীয় সরকার বিভাগ, খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়সহ অনেক মন্ত্রণালয়ের বিভাগের অধিশাখায়ও (উপসচিবের পদে) কাজ করছেন অতিরিক্ত সচিবরা। এদিকে অধিকাংশ যুগ্ম সচিব কাজ করছেন অধিশাখায় (উপসচিবের পদে)। অনেক যুগ্ম সচিব শাখাতেও (সিনিয়র সহকারী বা সহাকারী সচিবের পদে) কাজ করছেন। একইভাবে বেশিরভাগ উপসচিব কাজ করছেন সিনিয়র সহকারী বা সহাকারী সচিবের পদে। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে অনেক কর্মকর্তার বসার জায়গাও নেই পদ ছাড়া পদোন্নতির সমালোচনা করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খান বলেন, সারাবিশ্বে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে পদ ছাড়া পদোন্নতি হয়। তিনি বলেন, রাজনীতিকীকরণের ফলে দেশের প্রশাসন প্রায় ভেঙে পড়েছে। আর এটা করেছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো। এক দল আরেক দলের চেয়ে এটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
৮৪, ৮৫ ও ৮৬ ব্যাচের বঞ্চিত কয়েক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, তাদের চাকরি আছে মাত্র ছয় মাস থেকে বড়জোর দেড় বছর। এর মধ্যে বেশিরভাগ কর্মকর্তা ডিসেম্বরের মধ্যে পিআরএলে চলে যাবেন। যারা পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকে বর্তমান সরকারের আমলেই যুগ্ম সচিব হয়েছেন। অতিরিক্ত সচিবের পদ কম থাকায় অবসরে যাওয়ার আগে তাদের পদোন্নতির বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।
একইভাবে নবম, দশম ও ১১তম ব্যাচের কয়েকজন বঞ্চিত কর্মকর্তা বলেন, তাদের মধ্যে অনেকে সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে ডিসি ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর পিএসের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে তারা বঞ্চিত হয়েছেন। এ জন্য আগে তাদের পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনার জন্য দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন সময় সরকারদলীয় এমপি-মন্ত্রীদের ডিও লেটার দিয়ে তাদের পদোন্নতির বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনার জন্য অনুরোধ করেছেন। তবে অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা বলেন, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা সুপারনিউমারারি (সংখ্যাতিরিক্ত পদ সৃষ্টি) পদের নামে পদ না থাকলেও পদোন্নতি পাচ্ছেন। আর অন্য ক্যাডারে পদ থাকার পরও পদোন্নতিতে বিলম্ব হচ্ছে।
জানা যায়, প্রশাসনের বাইরে অন্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের যোগ্যতা অর্জনের পরও এক পদে ৮-১০ বছর পর্যন্ত পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ফলে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৩ ব্যাচের কর্মকর্তারা শিগগির অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে দ্বিতীয় গ্রেডে উন্নীত হবেন। অথচ বিসিএস ১৩ ব্যাচের অন্যান্য ক্যাডারের বেশিরভাগ কর্মকর্তা এখন গ্রেড-৪ পদে কাজ করছেন। অনেকে গ্রেড-৫ পদেও কর্মরত আছেন।
এ ছাড়া বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৮৪, ৮৫ ও ৮৬ ব্যাচের প্রায় ১০০ জন, নবম ও দশম ব্যাচের প্রায় ৪০ জন এবং ১১তম ব্যাচের ৫৫ কর্মকর্তা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত সচিব হতে পারেননি।
সংশ্নিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসন ক্যাডারের প্রতিটি ব্যাচে কিছু কর্মকর্তা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ে কাজ করেন। এ সুযোগে তারা সেই ব্যাচে প্রভাবশালী হয়ে পদোন্নতির জন্য জনপ্রশাসনে তদবির করেন। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সিনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত সচিব না হলেও জুনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ঘটনা বাড়ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২৪ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত সচিবের ১৩০টি পদের বিপরীতে ৪৫৭ জন এবং যুগ্ম সচিবের ৪৫০টি পদের বিপরীতে ৭৩৫ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। একইভাবে উপসচিবের এক হাজার ছয়টি পদের বিপরীতে রয়েছেন এক হাজার ৫৫৮ জন কর্মকর্তা। ফলে পদ না থাকার পরও পদোন্নতি পেয়ে কর্মকর্তাদের আগের পদেই (ইন সি টু) কাজ করতে হবে অথবা ওএসডি থাকতে হবে। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সচিব পদে বেশি লোকবল থাকার বিষয়টি স্বীকার করে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সমকালকে বলেন, অভিজ্ঞতার কারণে সিনিয়রদের পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে ক্যারিয়ার প্ল্যানিং চূড়ান্ত হলে এমনটা আর হবে না




Archives